মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে গত ছয় মাস ধরে চলা মার্কিন-ইসরাইল বনাম ইরান সংঘাত যখন এক বিশৃঙ্খল অচলাবস্থায় এসে ঠেকেছে, ঠিক তখনই ইরান জুড়ে বাজছে তেহরানের আত্মতৃপ্তির সুর! শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ইতি টানার এটাই উপযুক্ত সময়, কারণ ক্ষমতার পাল্লা নাকি এখন তেহরানের দিকেই ভারী!
দীর্ঘদিনের দুই পরাশক্তির রেষারেষিতে যখন হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ আর ওয়াশিংটন চাপিয়ে দিয়েছে নৌ-অবরোধ, তখন পেজেশকিয়ান এক চিকিৎসকদের অনুষ্ঠানে গিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, আমরা যেহেতু এখন শক্তি ও মর্যাদার শীর্ষে, তাই এখনই যুদ্ধ শেষ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
মার্কিন মিডিয়া এবং ওয়াশিংটনের চোখরাঙানিকে তুড়ি মেরে উ উড়িয়ে পেজেশকিয়ানের দাবি, বিশ্বজুড়ে সবাই ইরানের জয় স্বীকার করে নিয়েছে। তাঁর মতে, মার্কিন নীতি আজ চরমভাবে ব্যর্থ; তারা বিশ্বজুড়ে ঘৃণিত কারণ তারা স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
গত জুনে স্বাক্ষরিত থমকে যাওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির সমর্থনে সাফাই গেয়ে তিনি জানান, ওই চুক্তির কোথাও তেহরানের কোনো আত্মসমর্পণের গন্ধ নেই, সব দায়ভার আমেরিকার ঘাড়েই চাপানো হয়েছে। যদিও ইরানের চরমপন্থী আইনপ্রণেতারা এই চুক্তিকে ওয়াশিংটনের কাছে 'নতিস্বীকার' বলে তোপ দাগছেন, এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন কিছু দ্বিমত রেখেই।
যুদ্ধ যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন তেহরানকে গুঁড়িয়ে দিতে এক নজিরবিহীন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ বা সর্বাত্মক আর্থিক অবরোধের। কিন্তু ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই হুমকিকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে একে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আর্থিক সংকট ও পর্বতসম ঋণের বোঝা থেকে দৃষ্টি সরানোর সস্তা কৌশল বলে কটাক্ষ করেছেন।
তেহরানের সমর্থনে চীনও ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবরোধ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানান, চাবুক মেরে বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না; কূটনীতিতেই ভরসা রাখা ভালো। বিশেষ করে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হোয়াইট হাউস সফরের আগে এই জলঘোলা আরও নতুন মোড় নিচ্ছে।
একদিকে মার্কিন নৌবাহিনী চুপিচুপি হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ অংশ দিয়ে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবানের পথ পাহারা দিচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন নতুন করে কোপ বসিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ঘাড়ে।
ওয়াশিংটনের দাবি, হিজবুল্লাহ আইআরজিসির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। তবে হিজবুল্লাহও ছেড়ে কথা বলেনি; স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আমেরিকার এই ‘অন্যায় নিষেধাজ্ঞা’ দিয়ে ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ থামানো যাবে না। সব মিলিয়ে, সামরিক ময়দান থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করলেও বাস্তবতার ময়দানে এই স্নায়ুযুদ্ধ থমার কোনো লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: এএফপি-আল জাজিরা