যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরির প্রচেষ্টায় চীনের তেল কেনার বিষয়টি এখন মূল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশ্বজুড়ে ইরানের অপরিশোধিত তেলের সর্ববৃহৎ ক্রেতা হলো চীন, যা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
আন্তর্জাতিক জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলার বলছে, বিগত বছরগুলোতে চীন প্রতিদিন গড়ে ১.৪ মিলিয়ন (১৪ লাখ) ব্যারেল ইরানি তেল আমদানি করতো। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও জাহাজগুলোর ওপর পুনরায় অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করার পর এই প্রবাহে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
তেল আমদানির বর্তমান চিত্র: জুন মাসে চীনের ইরানি তেল আমদানি হ্রাস পেয়ে দৈনিক ৭,৮৫,০০০ ব্যারেলে নেমে আসে, যা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। জুলাই মাসে এটি সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক ৮,২৩,০০০ ব্যারেলে পৌঁছালেও, আগস্টের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায় চীন দৈনিক প্রায় ৫,৩৪,০০০ ব্যারেল তেল গ্রহণ করেছে।
ডেনমার্ক ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবহরের অবস্থান এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অনেক জাহাজের লোকেশন ট্র্যাকার (ট্রান্সপন্ডার) বন্ধ রাখার কারণে এই বাণিজ্যের সঠিক গতিপথ ট্র্যাক করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনা ক্রেতাদের পরিচয় ও কৌশল: চীনের রাষ্ট্রীয় তেলের রিফাইনারিগুলো মোটামুটি ২০১৯ সাল থেকেই (যখন প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের মূল নিষেধাজ্ঞা জারি হয়) প্রকাশ্যে ইরানি তেল কেনা বন্ধ রেখেছে। এমনকি চীনের সরকারি কাস্টমস তথ্যেও ইরান থেকে তেল আমদানির কোনো উল্লেখ দেখা যায় না।
মূলত চীনের স্বাধীন বা বেসরকারি রিফাইনারিগুলোই এই তেলের প্রধান ক্রেতা। বাজারের মূলমূল্যের চেয়ে ইরানি তেল বেশ সস্তায় ও ছাড়ে পাওয়া যায় বলেই তারা এটি কেনেন। এই লেনদেন সম্পন্ন হয় মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার তেলের লেবেল ব্যবহার করে এবং জটিল আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চায়নিজ মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও বেজিংয়ের অবস্থান: ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই চীন যাতে ইরানের তেল কিনতে না পারে, সে জন্য কড়াকড়ি বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু ছোট চীনা রিফাইনারি, পরিবহনকারী সংস্থা ও জাহাজের ওপর মার্কিন অর্থ দপ্তর থেকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে।
এছাড়া চীন ও হংকংয়ের বৃহৎ ব্যাংকগুলোকেও ইরানি তহবিলের লেনদেন থেকে বিরত থাকার সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে ‘হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল’ নামক এক বড় রিফাইনারির ওপর বিলিয়ন ডলারের ইরানি তেল কেনার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন অর্থ দপ্তর, যদিও হেংলি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে চীনের ইরানি তেল প্রবাহ কিন্তু একেবারে বন্ধ করা যায়নি। এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও যথাক্রমে ১.২৪ মিলিয়ন ও ১.৫৮ মিলিয়ন ব্যারেল করে ইরানি তেল চীনে প্রবেশ করেছে।
একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সব সময়ই প্রত্যাখ্যান করে আসছে চীন। বেজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ব বাজারে এই ধরনের চাপ সৃষ্টি কিংবা একতরফা পদক্ষেপ সমস্যার সমাধান করে না; বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স