ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের সপ্তম মাসে এসে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন এক সংকটে রূপ নিয়েছে। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের আকস্মিক ও শক্তিশালী অভিযানের মুখে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালী নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিয়ে হুথিরা ইয়েমেন উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। শুক্রবার তারা ইয়েমেন ও আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যবর্তী পেরিম দ্বীপে পৌঁছে গেছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার পর সৌদি আরব যে লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল পরিবহন করছিল, সেটিও এখন চরম হুমকির মুখে পড়ল।
এই আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে গেছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হতো, সেই হরমুজ প্রণালীতে ইরান আগেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। এবার হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালী পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের আরও ৭ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ১২ শতাংশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক স্টিফেন ওয়ার্থ হাইমের মতে, ট্রাম্প যে সামরিক সংঘাত কম রেখে ইরানের ওপর শুধু অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন, হুথিদের এই আকস্মিক অগ্রগতি সেই পরিকল্পনাকে পুরোপুরি ভেস্তে দিয়েছে।
সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা এটিকে একটি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কারণ এর মাধ্যমে বিশ্বের দুটি প্রধান জ্বালানি পরিবহন জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন এক চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানির দাম ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে দীর্ঘ লড়াইয়ে অভিজ্ঞ হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়া আমেরিকান বাহিনীর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নতুন এক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সূত্রমতে, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে মার্কিন সামরিক সহায়তার অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি জড়িয়ে না পড়ে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইয়েমেনের স্বাধীন সরকার ও আঞ্চলিক মিত্রদের একা রেখে লড়াই করা কিংবা মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়ে আবার হুথিদের বিরুদ্ধে নামা, এই দুই কঠিন বিকল্পের মধ্যে কোনটি বেছে নেয়া হবে, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স