মধ্যপ্রাচ্যে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত এবার চরম সংকটময় মোড় নিয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকা সৌদি আরব এখন প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের মারাত্মক ঘাটতিতে ভুগছে।
নিজ আকাশসীমা ও কৌশলগত স্থাপনা রক্ষায় প্যাট্রিয়ট বা সমমানের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের জোগান ফুরিয়ে আসায় রিয়াদ জরুরি ভিত্তিতে সামরিক সহায়তার জন্য আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার আশা নিয়ে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান এবং মিসরের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা পরিচালনা করছে।
সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বর্তমানে ইরানের সাথে বহুমুখী যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরোধী অস্ত্রের টানাপোড়েনে রয়েছে। টানা কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটি ও ইসরাইলের সুরক্ষায় বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের ফলে ওয়াশিংটনের কাছেই পর্যাপ্ত অস্ত্রের মজুত নেই। এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে রিয়াদ ইউরোপ ও এশিয়ার শক্তিধর দেশগুলোর সাহায্য চাইছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক দেশটি শুধু নিজেদের সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তায় ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের হামলায় সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেলের পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজে হুথিদের হামলায় তেল সরবরাহ ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এরই মধ্যে হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের কৌশলগত বাবেল মানদেবে প্রণালীর বিভিন্ন দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পুরো রুটটি অবরুদ্ধ করার হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের জন্য বাব আল মান্দেব বিকল্প পথ ছিল, যা এখন হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের দুই প্রধান রুট স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অভিযোগ করেছে যে হুথিরা মুসলিমদের পবিত্রতম নগরী মক্কার দিকে ড্রোন ছুড়েছিল, যা তারা ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। রিয়াদ একে ‘চূড়ান্ত সীমা’ অতিক্রম হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঠোর জবাবের হুমকি দিয়েছে, যদিও ইয়েমেনের সীমান্ত থেকে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে অবস্থিত মক্কায় ড্রোন পাঠানোর খবর হুথিরা অস্বীকার করেছে। উল্টো তারা ইয়েমেনের আকাশে সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি তুলে ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে সৌদি আরব কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করলেও মিত্রদের কাছ থেকে সরাসরি সামরিক সহায়তার আশ্বাস পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক এবং পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান সম্প্রতি সৌদি আরবের সাথে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে এক ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সমঝোতা করলেও, এখন পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সেনা বা অস্ত্র পাঠানোর কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ তাদের কাছে যায়নি। যদিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সৌদির সাথে অটল সংহতি প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইউরোপেই নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংকটে ভুগছে, ফলে তাদের পক্ষে দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ করা কার্যত অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রও এই মুহূর্তে হুথি-সৌদি দ্বিপক্ষীয় সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে; মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড কেবল তথ্য আদান-প্রদান ও সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে।
সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অন্যদিকে চরম আকার ধারণ করেছে। হুথিদের ঝটিকা অভিযানের পর হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে প্রায় এক লাখেরও বেশি ইয়েমেনি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হুথিরা দাবি করেছে যে লোহিত সাগর উপকূল ও হাজ্জাহ প্রদেশে সৌদি বিমান বাহিনী শত শত বিমান হামলা চালাচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান এই আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ওমানের মাসকাটে মার্কিন কর্মকর্তা ও হুথি প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন আলোচনা এবং তুরস্কের মধ্যস্থতায় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ইরানের শীর্ষ তেল আমদানিকারক দেশ চীন সফররত আইআরজিসি সম্পর্কিত পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে বৈঠকে বেইজিং সংঘাত কমানো ও হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জোর তাগিদ দিয়েছে। সামরিক সহায়তার অভাব ও তেল সরবরাহে বাধার মুখে রিয়াদ এখন এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও ভৌগোলিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এপি