আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে এবং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে ইচ্ছে করেই শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে ইরান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর অনাস্থা এবং নতুন করে সামরিক আক্রমণের আশঙ্কায় তেহরান দ্রুত কোনো চুক্তিতে সই করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে বলে দেশটির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের তিন কর্মকর্তা ও একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক জানান, দীর্ঘ আট মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ থামানোর কোনো ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং ইরান নতুন করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমেরিকার সাথে চুক্তির জন্য নয়। ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেহরান কোনো অবস্থাতেই ট্রাম্পকে একটি সহজ রাজনৈতিক উপহার বা বিজয় অর্জন করতে দেবে না। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বেআইনি পদক্ষেপ ছাড়াই শুধু আলোচনা দীর্ঘায়িত করে আমেরিকার নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে ইরান।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইল ইরানে একের পর এক হামলা চালালে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বরের কংগ্রেশনাল নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী ইরান অবরুদ্ধ করে রাখায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান একটি প্রস্তাব পেশ করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন যদি তাদের সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেয়, তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, বাজেয়াপ্ত অর্থ ফেরত দেয় এবং সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধ করে, তবে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনও বহাল রয়েছে এবং বার্তা আদান-প্রদান চলছে। তবে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই ইরানের বহু বছরের পরমাণু কর্মসূচি বাতিলের বিষয়টি টেবিলে আনতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের ভেতরে এই কৌশলের চড়া মূল্যও দিতে হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থা এবং মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের রিয়াল মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে এবং বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৭৩.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে এসব অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও মার্কিন সরকারের ওপর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস রাখতে পারছে না তেহরান। অতীতে একাধিকবার আলোচনার পথ মাঝপথে আটকে দিয়ে হামলা চালানোয় দুই দেশের আস্থা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য চুক্তি নয়, বরং ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো। ফলে ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের আগে এই অচলাবস্থা কাটার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স