ইরান হামলা থেকে কেন পিছিয়ে এলেন ট্রাম্প?

মধ্যপ্রাচ্যের আট মাসব্যাপী চলমান সংঘাতকে আরও ভয়াবহ ও উসকে দেওয়ার মতো বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। ইরানি লক্ষ্যবস্তুর একটি বিস্তৃত তালিকা তৈরি করেছে তারা, যার মধ্যে ইরানের পরমাণু সুবিধা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

পূর্বে মার্কিন অভিযানগুলো মূলত ইরানের মিসাইল লাঞ্চার বা রাডার সিস্টেম ধ্বংসের মতো সীমিত পরিসরে হলেও, এবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং পেন্টাগনের পরিকল্পনাকারীরা বড় ধরনের অভিযানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছেন। কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ পাওয়ার মাত্র ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী এই সামরিক অভিযান শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

অনেক কর্মকর্তার ধারণা, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই অথবা চলতি বছরের শেষের দিকেই এই সামরিক হামলা শুরু হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি এবং ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত কোনো নির্দেশ জারি করেননি।

US vs Iran 1
হামলা পেছানোর কারণ ও ইসরাইলকে মার্কিন বার্তা:
হামলার জন্য সামরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এর সময়সীমাকে প্রভাবিত করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন, অন্যদিকে ইরানি ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের পাল্টা ভয়াবহ আক্রমণের ঝুঁকি মার্কিন নীতি নির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। সিআইএ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আক্রমণ চালানো মাত্রই ইয়েমেনের হুথি ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও কর্মীদের ওপর তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে পারে। এই চরম নিরাপত্তার আশঙ্কায় ইতোমধ্যে রিয়াদসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন দূতাবাস থেকে অতিরিক্ত কর্মী সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে ওয়াশিংটন।

এদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরাইলের নির্বাচনের আগেই ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক হামলার জন্য চাপ সৃষ্টি করলেও, ওয়াশিংটন ইসরাইলকে একক হামলা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথ অভিযানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে অপেক্ষা করতে হবে। তা ছাড়া দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইসরাইলের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আকাশ সুরক্ষা গোলাবারুদে কিছুটা সংকট তৈরি হওয়ায় তারাও এখন মার্কিন সহায়তার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

Iran War
হরমুজ প্রণালী সংকট ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা:
এদিকে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ ও উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সম্প্রতি কৌশলগত এই জলসীমা পরিদর্শন করেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা এই পরিস্থিতিকে দীর্ঘ মেয়াদে অসহনীয় বলে আখ্যা দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হরমুজের এই সংকটই হয়তো ট্রাম্পকে সামরিক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তবে যুদ্ধপ্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি। সংঘাত এড়াতে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা আলোচনায় বসতে সোমবার তেহরানে পৌঁছেছেন। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চললেও, একই সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে।