জল্পনা ছিলো আগেই, তবে এবার পাকাপাকি হলো যে, নিজের পুরানো কেন্দ্র উত্তরপ্রদেশের আমেথি থেকে এবার ভোটে লড়বেন না রাহুল গান্ধী। ২০০৪ থেকে টানা তিনবার আমেথি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতেন, কিন্তু গতবার (২০১৯) বিজেপির স্মৃতি ইরানির কাছে পরাজিত হন ভারতের কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা। গতবারের পরাজয়ই কি এবার রাহুলকে সন্ত্রস্ত করেছে, নাকি দলীয় কৌশলের কারণেই আমেথি থেকে সরে গেলেন তিনি?
রাহুল গান্ধী প্রার্থী হয়েছেন আমেথির পাশেই রায়বরেলি আসন থেকে। এটা তাদের পূর্বপুরুষদের আসন। মা সোনিয়া গান্ধী রায়বরেলির দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি রাজ্যসভায় চলে যাওয়ায়, এবার রায়বরেলির আসন ফাঁকা হয়ে যায়। কংগ্রেসের দুর্গ হিসেবে খ্যাত রায়বরেলিতেই শেষমেষ আশ্রয় খুঁজেছেন রাহুল।
শুক্রবার সোনিয়া গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেসহ দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে রাহুল গান্ধী রায়বরেলিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আর আমেথিতে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা কিশোরী লাল শর্মা, যিনি এক সময় রাহুলের বাবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমেথির নাম। এই পরিবারের চারজন সদস্য এই আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন, যাদের মধ্যে ছিলেন রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীও। এছাড়া সঞ্জয় গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধী নির্বাচিত হয়েছেন এই আসনে।
তবে এবার রাহুলের সরে যাওয়ায় নানা জল্পনার সঙ্গে ডালপালা মেলেছে গুজব আর অনুমান। বিজেপি দাবি করছে, রাহুল প্রার্থী হলে ২০১৯ সালের মতোই স্মৃতি ইরানির কাছে পরাজয় ছিলো অনিবার্য। আর এটা বুঝতে পেরেই উত্তরপ্রদেশে গান্ধী পরিবারের একমাত্র ‘অবশিষ্ট দুর্গ’ রায়বরেলিতে ‘আশ্রয়’ নিয়েছেন তিনি।
জরিপ বলছে, আমেথিতে এবার কংগ্রেসের বিজয়ের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। তাই এখানে গান্ধী পরিবারের কেউ সরাসরি প্রার্থী না হয়ে, আসনটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এমন একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যিনি বিজেপির কাছ থেকে উদ্ধার করে আনতে পারবেন আমেথিকে।
আমেথি কেনো গুরুত্বপূর্ণ
ভারতের রাজনীতিতে গান্ধী পরিবারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন পূর্ব উত্তরপ্রদেশের এই আমেথি। প্রায় অর্ধশত ধরে এই আসনটির সঙ্গে গান্ধী পরিবার জড়িত। ১৯৭৭ সালে এই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন রাজীবের ভাই সঞ্জয়। কিন্তু দেশ জুড়ে প্রবল ইন্দিরাবিরোধী জনমতের কারণে ভরাডুবি ঘটে সঞ্জয়ের। তিন বছর ১৯৮০ পরবর্তী লোকসভা ভোটে আমেথি থেকে বিজয়ী হন তিনি। এর এক বছরের মাথায় সঞ্চয় গান্ধী বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে সেখানে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন রাজীব গান্ধী।
১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পরও আমেথিতে কংগ্রেসের রাজত্ব চলতেই থাকে। এখান থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী। ১৯৮০ সালের পর এই আসনে শুধু দুইবার পরাজিত হয়েছে কংগ্রেসের প্রার্থী। স্বাভাবিকভাবেই গত পাঁচ দশকে ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ আসন আমেথি।
কে এই কিশোরী লাল
ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে আমেথির উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য হন ইন্দিরা গান্ধীর বড় ছেলে রাজীব গান্ধী। কিন্তু তিনি সার্বক্ষণিকভাবে সংসদীয় আসনে সময় দিতে না পারায় পাঞ্জাবের বাসিন্দা কিশোরী লাল শর্মাকে আমেথিতে নিয়ে আসেন এবং সেখানকার রাজনীতি দেখভালের দায়িত্ব দেন।
ওই সময় থেকেই কিশোরী লাল আমেথিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। আমেথির পাশাপাশি রায়বরেলি ও সুলতানপুরেও কংগ্রেসের দেখভাল শুরু করেন তিনি। ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর তার বন্ধু সতীশকে আমেথি থেকে জিতিয়ে আনতে প্রধান ভূমিকা রাখেন কিশোরী লাল। ১৯৯৬ সালেও সতীশ জিতেন, কিন্তু হেরে যান ১৯৯৮ সালের ভোটে।
এরপর অনেকটা হঠাৎ করেই ১৯৯৯ সালের লোকসভা ভোটে আমেথি থেকে ভোটে দাঁড়ান সোনিয়া গান্ধী। যথারীতি সেই নির্বচন পরিচালনাতেও মুখ্য ভূমিকা নেন কিশোরী লাল শর্মা।
২০০৪ সাল থেকে টানা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর জয়ের পেছনে ভূমিকা রয়েছে প্রবীণ এই কংগ্রেস নেতার। আমেথির অলিগলির পরিচিত মুখ কিশোরী এবার কঠিন এক লড়াইয়ের সামনে। তাকে লড়তে হবে স্মৃতি বিজেপির স্মৃতি ইরানির সঙ্গে, যিনি গতবার ৫৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন রাহুলকে। বিজপিতেও অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বর্তমান মন্ত্রীসভার সদস্য স্মৃতি।
কেনো আমেথি থেকে রায়বরেলিতে রাহুল
সারা ভারতে কংগ্রেসের দুর্গ হিসেবে এখনো খ্যাত উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি। এখান থেকেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যেখানে তার মা দীর্ঘদিন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এবার সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট বেঁধেছে কংগ্রেস। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের জন্য ১৬টি আসন ছেড়েছে অখিলেশ যাদবের দল। আসন সমঝোতায় একটি শর্ত ছিলো, গান্ধী পরিবারের ভাইবোনদের একজনকে উত্তরপ্রদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
এর কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ভোট এজেন্টরা আমেথি ও রায়বরেলিতে বেশ কয়েক দফা জরিপ ও সমীক্ষা চালায়। এসবে দেখা যায়, উত্তর প্রদেশে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের একজন সদস্যকে প্রার্থী করা হলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। তবে আমেথিতে সাফল্যের আশা মাত্র ৫০ শতাংশ।
সমীক্ষার ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে, রায়বরেলির জন্য বেছে নেওয়া হয় রাহুলকে। কারণ, ভারত স্বাধীনের পর থেকে এই আসনের সঙ্গে জড়িত নেহরু-গান্ধী পরিবার। একসময় ফিরোজ গান্ধী ও ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন রায়বরেলির সংসদ সদস্য। ২০০৪ থেকে গত লোকসভা ভোট পর্যন্ত টানা জিতেছেন সোনিয়া। কিন্তু সোনিয়া যেহেতু এবার ভোট করবেন না, তাই পরিবারের প্রার্থী হিসেবে রাহুলকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আমেথির জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তাই অভিজ্ঞ কিশোরী লাল শর্মাকে আমেথির জন্য বাছাই করা হয়। কারণ, উত্তরপ্রদেশে গতবারের ভয়াবহ ভরাডুবির স্মৃতি এবার ভুলতে চায় কংগ্রেস। ২০১৯ সালে উত্তরপ্রদেশের ৮০ আসনের মধ্যে একমাত্র রায়বরেলিতে জয়লাভ করেন সোনিয়া গান্ধী। সেই ভরাডুবির জন্য বিশেষ করে আমেথিতে রাহুল গান্ধীর পরাজয়ের জন্য দলের পক্ষ থেকে কিশোরী শর্মাকে দায়ী করা হয়েছিলো। তবে সে দফায় তাকে রক্ষা করেন সোনিয়া ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।
ইন্ডিয়া টুডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই দিন আগে যখন শর্মাকে ১০ নম্বর জনপথ রোডে ডেকে ‘প্রস্তুত হতে’ বলা হয়েছিলো, তখন তিনি অভিভূত হয়েছিলেন। আর এই শর্তে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন যে, ‘গান্ধী’রা তাকে যেনো সমর্থন করে এবং তার জন্য প্রচারের মাঠে নামে।
এরি মধ্যে কথা রেখেছে গান্ধী পরিবার। আমেথিতে তিনটি জনসভায় তারা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সোনিয়া, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর উপস্থিতি কংগ্রেসের এক সময়ের ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে কিশোরী লালকে একটি বিশ্বাসযোগ্য লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে সাহায্য করবে।