নেপালে 'বালেন' ঝড়ে ভূমিধ্বস জয়ের পথে আরএসপি

নেপালের সংসদীয় রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। গত ৫ মার্চের সাধারণ নির্বাচনে সব প্রথাগত সমীকরণ ভেঙে দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও জনপ্রিয় র‍্যাপার বালেন্দ্র শাহের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম নেপালের কোনো একক দল সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে।

৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি বালেন নামেই বেশি পরিচিত, শুধু তার দলকেই জেতাননি, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে তার নিজস্ব দুর্গ হিসেবে পরিচিত ‘ঝাপা-৫’ আসনে পরাজিত করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন। অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তম দল নেপালি কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট গগন থাপাও নিজের আসন হারিয়েছেন। এই জয় বালেন শাহের নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে।


নেপালের জটিল দ্বৈত নির্বাচনী ব্যবস্থায় (সরাসরি এবং সমানুপাতিক) কোনো একটি দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। তবে, আরএসপি সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সরাসরি ভোটে ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১২৪টিতে জয়লাভ করেছে আরএসপি। আর, সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ১১০টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫৮টিতে জয় নিশ্চিত করেছে তারা।

২৭৫ আসনের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১৮৪টি আসন প্রয়োজন, যার থেকে বালেনের দল এখন মাত্র দুটি আসন দূরে রয়েছে।

বালেন শাহ হতে যাচ্ছেন গণতান্ত্রিক নেপালের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ও প্রথম ‘মধেসি’ প্রধানমন্ত্রী। নেপালের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে একজন ‘মধেসি ভূমিপুত্র’কে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে দেখা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


মধেসি হলো নেপালের দক্ষিণভাগের তেরাই অঞ্চল এবং ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের সীমান্তবর্তী সমতল ভূমিতে বসবাসকারী একটি নৃগোষ্ঠী। এরা মূলত মৈথিলী, ভোজপুরি, ও অওয়াধি ভাষায় কথা বলে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণে ভারতের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং নেপালের রাজনীতিতে তারা একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

ছয় মাস আগে ওলি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগে যে ছাত্র-যুব আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, এই নির্বাচন সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন। বালেনের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, অনেক জায়গায় মানুষ তাদের স্থানীয় প্রার্থীর নাম না জানলেও আরএসপির নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘণ্টা’ দেখে ভোট দেন। এটি কার্যত একটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্টাইলের নির্বাচনী প্রচারণায় পরিণত হয়, যার কোনো জবাব ছিল না পুরনো দলগুলোর কাছে। ফলে বালেনের দল এখন ভূমিধ্বস জয় থেকে ইঞ্চি দূরত্বে দাঁড়িয়ে।


চূড়ান্ত ফলাফল এখনো ঘোষণা না হলেও আরএসপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন নিশ্চিত। কাঠমান্ডুর অলিগলি এখন সমর্থকদের উল্লাসে মুখরিত। সমর্থকরা হাতে ‘ঘণ্টা’ নিয়ে নেচে-গেয়ে তাদের প্রিয় নেতার জয় উদযাপন করছেন। বালেনের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা এই বিশাল জনম্যান্ডেটের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, কাঠমান্ডু পোস্ট