তামিলনাড়ুর রাজনীতির অলিন্দে এখন একটাই নাম- বিজয়। রূপালি পর্দার 'থালাপাতি' বা সেনাপতি এখন রাজনীতির ময়দানেও ঝড় তুলছেন। ভারতে তামিলনাড়ুই বোধহয় একমাত্র জায়গা যেখানে তারকারা শুধু অভিনেতা থাকেন না, হয়ে ওঠেন পরম পূজনীয় দেবতা।
মহারাষ্ট্রের বাস কন্ডাক্টর রজনীকান্ত হোন বা কর্ণাটকের জয়ললিতা, জনগণ একবার আপন করে নিলে সাধারণ মানুষ পৌঁছে যান দেবত্বে। কিন্তু সিনেমার জনপ্রিয়তা থাকলেই যে, রাজনীতিতে সফল হওয়া যায়, ইতিহাস তা বলে না। সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙতে চলেছেন জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর।
তামিল রাজনীতিতে সিনেমার গ্ল্যামারকে সফলভাবে ভোটে রূপান্তর করেছিলেন একমাত্র এমজি রামাচন্দ্রন। তবে তাঁর সেই যাত্রা ছিল দীর্ঘ পরিশ্রমের। ১৯৫০-এর দশকে ডিএমকে-তে যোগ দিয়ে কয়েক দশক ধরে সমাজ সংস্কারের ডাক দিয়ে নিজের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, অন্ধ্রপ্রদেশে এনটি রামা রাও (এনটিআর) তেলুগু পর্দার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে কয়েক মাসেই ক্ষমতা দখল করেছিলেন। বিজয়ের বর্তমান পারফরম্যান্স অনেককে এনটিআর-এর সেই ঝোড়ো গতির কামব্যাকের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
১৯৭৪ সালে চেন্নাইয়ে চলচ্চিত্রকার এস. এ. চন্দ্রশেখর এবং গায়িকা শোভার ঘরে জন্ম বিজয়ের। তবে তাঁর শুরুর দিনগুলো মোটেও রাজকীয় ছিল না। আশির দশকে শিশু অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করা বিজয় নব্বইয়ের দশকে যখন হিরো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সমালোচকরা তাঁকে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছিলেন।
বিজয় যখন শুরু করেন, তখন তাঁর মধ্যে রজনীকান্তের মতো সেই অতিপ্রাকৃত স্টাইল ছিল না, কিংবা কমল হাসানের মতো অভিনয়ের গভীর পাণ্ডিত্যও ছিল না। বিজয় ছিলেন আমাদের পাশের বাড়ির ছেলের মতো- যাঁকে বাসের স্টপেজে বা আত্মীয়ের বিয়ের ভিডিওতে লাজুক ভঙ্গিতে নাচতে দেখা যায়।
এই 'অর্ডিনারি' বা সাধারণ ইমেজটাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে জনগণের প্রিয় করে তুলেছে। পর্দার বিজয় আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে পারতেন, আবার নিঃশব্দে কষ্ট সইতেও পারতেন। পরিবারের মন জয় করতে করতে তিনি কখন যে গোটা তামিলনাড়ুর মন জয় করে নিয়েছেন, তা কেউ টেরই পায়নি।
প্রাথমিক ট্রেন্ড যদি সঠিক হয়, তবে তামিল রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। যে ছেলেটিকে এক সময় পর্দায় দেখে সবাই নাক সিঁটকেছিল, আজ সেই ছেলেই রাজনীতির ‘থালাপাতি’ হয়ে তামিলনাড়ুর ভাগ্য নির্ধারণের পথে। বিজয় প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, সিনেমার লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করতে হলে সেই চেনা পরিচিত সাধারণ মুখটাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
এখন দেখার বিষয়, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে কোবি মাইনোর অন্তিম মুহূর্তের গোলের মতো, বিজয়ও কি রাজনীতির শেষ বাঁকে এসে গোল দিয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করতে পারেন কি না। তবে, এটুকু নিশ্চিত, তামিলনাড়ুর জনতা তাদের নতুন দেবতাকে বরণ করে নিতে আজ পুরোপুরি প্রস্তুত!