ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘ ছয় দশকের দ্রাবিড় আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে রোববার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন 'তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম' (টিভিকে) প্রধান থালাপাতি বিজয়। শপথ গ্রহণের পরপরই জনকল্যাণমূলক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে সই করে নিজের প্রশাসনিক যাত্রা শুরু করেছেন এই অভিনেতা-রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রথম আদেশে রয়েছে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পরিষেবা, মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং নারী নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বাহিনী ও হেল্পলাইন চালু করা।
শপথ গ্রহণ শেষে বিজয় তাঁর চিরচেনা শৈলীতে 'এন নেঞ্জিল কুদিয়িরুক্কুম' (আমার হৃদয়ে যারা আছো) সম্বোধন করে ভাষণ শুরু করেন। তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, একজন সহকারী পরিচালকের ছেলে আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে। আমি রাজপরিবার থেকে আসিনি, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা কাছ থেকে দেখেছি। অনেক অপমান সহ্য করে আজ আপনাদের ভাই বা ছেলে হিসেবে এখানে দাঁড়িয়েছি।
বিজয় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পানীয় জলের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো তাঁর সরকারের অগ্রাধিকার পাবে। এছাড়া কৃষক ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেবেন তিনি। ডিএমকে আমলের বিপুল ঋণের (১০ লক্ষ কোটি টাকা) কথা উল্লেখ করে তিনি অঙ্গীকার করেন, জনগণের একটি টাকাও কাউকে লুট করতে দেয়া হবে না এবং কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে না।
জোটের রাজনীতি ও নতুন সমীকরণ: গত ৪ মে ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই তামিলনাড়ুর সরকার গঠন নিয়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়ের টিভিকে ১০৮টি আসন পেলেও ম্যাজিক ফিগার (১১৮) থেকে দূরে ছিল। শেষ মুহূর্তে কংগ্রেস, বাম দল (সিপিআই ও সিপিআই-এম), ভিসিকে এবং আইইউএমএল-এর সমর্থনে বিজয়ের জোট ১২০টি আসনে পৌঁছায়।
মজার বিষয় হলো, ডিএমকে মুখপাত্র এ সারাভানান দাবি করেছেন, রাজ্যে 'সাংবিধানিক সংকট' এড়াতেই স্বয়ং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন তাঁর মিত্রদের (ভিসিকে) বিজয়ের পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী উপস্থিত থেকে বিজয়কে অভিনন্দন জানান।
বিজয়ের মন্ত্রিসভার চমক: বিজয়ের সাথে আজ ৯ জন মন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রণকৌশলী থেকে শুরু করে তরুণ মুখের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন- বিজয়ের অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ আদভ অর্জুন, সাবেক বিজেপি নেতা সিটিআর নির্মল কুমার, টিভিকের সাধারণ সম্পাদক ‘বুসি’ আনন্দ, ২৮ বছর বয়সী মন্ত্রিসভার কনিষ্ঠতম সদস্য এস কীর্তনা। এছাড়াও রয়েছেন সাবেক আইআরএস কর্মকর্তা অরুণরাজ এবং চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব রাজ মোহন।
পরবর্তী চ্যালেঞ্জ: তামিলনাড়ুর ইতিহাসে এটিই প্রথম জোট সরকার এবং দীর্ঘ ৬০ বছর পর প্রথম অ-দ্রাবিড় (ডিএমকে ও এআইএডিএমকে বহির্ভূত) সরকার। তবে, বিজয়ের জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষা হবে বিধানসভার ফ্লোর টেস্ট। আগামী ১৩ মের মধ্যে তাঁকে বিধানসভায় নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে।
শপথ গ্রহণের এই অনুষ্ঠানটি শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং তামিলনাড়ুর মানুষের কাছে এটি এক নতুন যুগের সূচনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, রূপালি পর্দার এই নায়ক বাস্তবের প্রশাসনিক লড়াইয়ে কতটা সফল হন।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও এনডিটিভি