মোদীর ভিত নাড়িয়ে দেয়ার হুংকার ‘তেলাপোকা’ পার্টির!

ভারতের ১.৪২ বিলিয়ন জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। আর এই বিশাল তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করে মাত্র কয়েক দিনে কোটি কোটি ফলোয়ারের এক অভাবনীয় অনলাইন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে একটি নতুন যুব আন্দোলন, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

তবে এই লড়াই এবার আর শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনলাইনের ঝড় এবার আছড়ে পড়তে চলেছে রাজপথে। খোদ দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ১২ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে এক বিরাট প্রতিবাদের ডাক দিয়ে আগামী সোমবার ভারতের রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়েছেন এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।

Cockroach Party 02
বর্তমানেযুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এই তরুণ তুর্কি ভারতে চলমান শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ফাইনাল পরীক্ষার মূল্যায়নে নজিরবিহীন ভুলের কারণে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যখন খাদের কিনারায়, ঠিক তখনই এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মাঠে নেমেছে সিজেপি।

নিজের ব্যক্তিগত এক্স অ্যাকাউন্টে অভিজিৎ দিপকে ঘোষণা করেছেন, আমি সরাসরি ভারতে ফিরছি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে। দিল্লির বুকে একটি শান্তিপূর্ণ গণবিক্ষোভে যোগ দেয়ার জন্য দেশের তরুণ সমাজকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতা চাওয়া আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।

ইতিমধ্যেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে ৮ লক্ষ শিক্ষার্থী একটি গণস্বাক্ষর পিটিশনে সই করেছেন, যদিও এই বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বা সরকারি মুখপাত্রের কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

Cockroach Party 04
দলটির অদ্ভুত নাম ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা কেন?

এই আন্দোলনের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক চরম বিদ্রূপাত্মক এবং চটকদার ইতিহাস। কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের বেকার যুবকদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচের সাথে তুলনা করেছিলেন।

পরে অবশ্য ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে প্রধান বিচারপতি সাফাই দেন যে, তিনি সাধারণ তরুণদের ছোট করতে চাননি, বরং যারা ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রি’ নিয়ে বসে আছে তাদের উদ্দেশ্য করেই এই মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ততোক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে!

এই অপমানকেই হাতিয়ার বানিয়ে যুবসমাজ নিজেদের দলের নাম রেখে দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। বর্তমানে শুধুমাত্র ইনস্টাগ্রামেই এদের ফলোয়ার সংখ্যা ২২ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলোতে মোদীর দল জয় পেলেও, ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের কারণে ভারতে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং গ্যাসের তীব্র সংকটে সাধারণ মানুষের যে নাভিশ্বাস উঠেছে, তার সাথে এই যুব বিদ্রোহ যোগ হয়ে মোদী ভাবমূর্তিতে বড় ফাটল ধরাতে পারে।

Cockroach Party 03
গ্রেপ্তারের ভয় ও সরকারের ‘পাকিস্তান’ কার্ড

আমেরিকায় দুই বছর ধরে থাকা অভিজিৎ দিপকে স্বীকার করেছেন, ভারতে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে তাঁর পরিবার ও বন্ধুবান্ধবরা চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তবে সাহসের সাথে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, আমরা আর কতদিন এভাবে ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকব?

ইতিমধ্যেই সিজেপির ‘এক্স’ অ্যাকাউন্টটি ভারতে ব্লক করা হয়েছে এবং তাদের ইনস্টাগ্রাম পেজটিও হ্যাকারদের কবল থেকে উদ্ধার করতে হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দিপকে।

এদিকে এই তরুণদের উত্থানে রীতিমতো কেঁপে উঠেছে দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ইতিমধ্যেই সিজেপির বিরুদ্ধে চিরাচরিত ‘দেশবিরোধী’ তকমা সেঁটে দিয়ে অভিযোগ করেছেন যে, এই দল নাকি চিরশত্রু পাকিস্তান এবং ‘ভারত-বিরোধী গ্যাং’ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার কিনছে! প্রধানমন্ত্রী মোদী অবশ্য এই বিষয়ে এখনো নীরব।

Cockroach Party 05
তবে ক্ষোভের আগুন কতটা তীব্র, তা বোঝা যায় সরকারের একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তেই। গত মাসে প্রশ্ন ফাঁসের কারণে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হওয়ায় দেশজুড়ে যে তীব্র ছাত্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে এবার পুনর্নির্বাচনের প্রশ্নপত্র বহনের জন্য ডাক বিভাগের ওপর ভরসা না রেখে সরাসরি ভারতীয় বিমানবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে মোদি সরকার।

এছাড়া সিজেপি দেশের তীব্র বেকারত্বকেও সামনে এনেছে; যেখানে সরকারি তথ্যই বলছে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার গত বছর ছিল ৯.৯%, যা দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হারের (৩.১%) চেয়ে তিন গুণ বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ‘তেলাপোকা’ বাহিনী এখন দিল্লির রাজপথে কী ধরণের রাজনৈতিক সুনামি তৈরি করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়!