মমতার দুর্গে চরম ধস, ভাঙনের মুখে তৃণমূল!

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের আসল নজর এখন তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ সদস্যের বিধায়ক দলের অন্দরে তৈরি হওয়া তীব্র ফাটলের দিকে। তবে, বিজেপির লক্ষ্য রাজ্য রাজনীতি নয়, বরং দিল্লির সংসদ।

ভারতের সংবিধানে বড় ধরণের কিছু আমূল পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল মসৃণভাবে পাস করানোর জন্য কেন্দ্রে এনডিএ জোটের যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, তা পূরণ করতেই তৃণমূলের এই সম্ভাব্য ভাঙনকে 'মহা পুরস্কার' হিসেবে দেখছে গেরুয়া শিবির।

বিজেপির এক শীর্ষ নেতা এই রাজনৈতিক কৌশলের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো বাড়তি সমর্থনের প্রয়োজন নেই। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো লোকসভা ও রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সংখ্যা বাড়ানো। তৃণমূল যদি এখন ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, তবে দলছুট সংসদ সদস্যরা সংসদে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেন। আমাদের উচ্চাভিলাষী আইনগুলো পাস করানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড়ে তাঁদের সমর্থন বিজেপির জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে।

TMC crisis 02
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় ধরণের বিপদের ইঙ্গিত দিয়ে গত বুধবার রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাক্তন এই সিপিআই(এম) নেতা ২০১৮ সালে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বর্ষীয়ান নেতা শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করলেও, ঋতব্রত দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনের সমর্থন দাবি করে পদটি ছিনিয়ে নেন। পরে তিনি দাবি করেন, বিদ্রোহী শিবিরে অন্তত ৬০ জন বিধায়ক রয়েছেন।

বিজেপি শিবিরের অন্দরে বাংলার এই পরিস্থিতিকে ২০২২ সালের মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও এনসিপি ভাঙনের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি আম আদমি পার্টিতে হওয়া ভাঙনের সাথেও এর মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে, যেখানে রাঘব চাড্ডার নেতৃত্বে ১০ জন রাজ্যসভা সংসদ সদস্যের মধ্যে সাত জনই বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এর ফলে ২৪৫ আসনের উচ্চকক্ষে এনডিএ’র শক্তি ১৪১-এ পৌঁছে গেছে।

এক বিজেপি নেতার কথায়, “শিবসেনা, এনসিপি বা আপ-এর মতোই তৃণমূলের একটি বড় অংশ সংসদে বিজেপির পাশে দাঁড়াবে। আর এটা হলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার যে আক্ষেপ বা কলঙ্ক আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছিল, তা সম্পূর্ণ মুছে যাবে।

TMC crisis 03
গত এপ্রিল মাসে লোকসভায় ‘সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল’ বা ‘ডিলিমিটেশন বিল’ (আসন পুনর্বিন্যাস বিল) পাস করাতে গিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছিল মোদী সরকার। লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার লক্ষ্য নিয়ে আনা এই বিলটি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় আটকে যায়। তখন কংগ্রেস, ডিএমকে ও তৃণমূলের মতো দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ইন্ডিয়া জোটের ২৩০ জন সাংসদ একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে ভোট দেন, যেখানে এনডিএ’র পক্ষে ছিল ২৯৮টি ভোট। এই আইনটিকে পুনরায় বাঁচিয়ে তুলতে এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই 'এক দেশ এক নির্বাচন' বিল কার্যকর করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি।

এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিজেপি এখন শুধু তৃণমূলের ভাঙনের দিকেই তাকিয়ে নেই, তারা দক্ষিণ ভারতের অন্যতম বড় শক্তি ডিএমকে’র সাথেও যোগাযোগ শুরু করেছে। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়া এবং তামিলনাড়ুতে অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের দল 'টিভিকে' সরকারের সাথে জোটসঙ্গী কংগ্রেস হাত মেলানোয় বেশ ব্যাকুল অবস্থায় রয়েছে ডিএমকে। এই পরিস্থিতিতে তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে ইস্যুভিত্তিক সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে বলে সূত্রের খবর। আঞ্চলিক দলগুলোর আপত্তি দূর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যেই ডিলিমিটেশন বিলের একটি সংশোধিত খসড়া তৈরি করছে।

TMC crisis 05
সংসদের ফ্লোর ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা এক প্রবীণ বিজেপি সংসদ সদস্য হিসেব কষে দেখিয়েছেন, ডিএমকে’র ২২ জন সাংসদ যদি যুগপৎ নির্বাচন বা যে কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীতে সমর্থন জানাতে রাজি হয়, তবে ৫৪৩ আসনের পূর্ণ হাউজে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে এনডিএ’র আর মাত্র ৪২টি ভোটের প্রয়োজন হবে। এমতাবস্থায় তৃণমূল ভেঙে যদি ১৫, ২০ বা ২৫ জন সংসদ সদস্যের একটি নতুন ব্লক তৈরি হয়, তবে বিজেপি খুব সহজেই সেই ম্যাজিক ফিগার ছুঁয়ে ফেলবে।

অন্যদিকে, 'এক দেশ এক নির্বাচন' বিলটি বর্তমানে ৩৯ সদস্যের একটি যৌথ সংসদীয় কমিটির স্ক্রুটিনিতে রয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন বিজেপি নেতা পি পি চৌধুরী। সরকার চাইছে দ্রুত এই বিলটি পাস করিয়ে ২০২৯ সালের আগেই ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিতে, আর সেই পথেরই মূল চাবিকাঠি এখন লুকিয়ে আছে বাংলার তৃণমূল ও তামিলনাড়ুর ডিএমকে-র রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস