তৃণমূলের দুর্দিনের মমতার পাশে কারা দাঁড়িয়ে?

বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজয়ের মাত্র এক মাসের মধ্যেই কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে তৃণমূল কংগ্রেস। গত মঙ্গলবার কলকাতার রাস্তায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্না কর্মসূচিতে দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৮ জন এবং ৪১ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে মাত্র ছয় জন উপস্থিত ছিলেন। আর এর ঠিক ২৪ ঘণ্টা পরেই, বুধবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৬০ জন বিধায়ক সরাসরি মমতার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন।

ৱএই গণ-বিদ্রোহের পর রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই বড় প্রশ্ন- তৃণমূলের এই চরম দুর্দিনে শেষ পর্যন্ত কারা দাঁড়িয়ে আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে?

মঙ্গলবার ধর্মতলার রাজপথে মমতার প্রথম প্রতিবাদ মিছিলে যে আটজন বিধায়ককে তাঁর পাশে দেখা গেছে, তাঁরা হলেন, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, কুণাল ঘোষ, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অশোক দেব এবং অসীমা পাত্র।

TMC crisis 03
আর সাংসদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শুধু ডেরেক ও'ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, সামিরুল ইসলাম, মেনকা গুরুস্বামী এবং নাদিমুল হক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লোকসভার একমাত্র সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া বাকি পাঁচজনই রাজ্যসভার সাংসদ।

মমতা শিবিরের এই বিশ্বস্ত নেতাদের সিংহভাগই ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে তাঁর ছায়াসঙ্গী। এর মধ্যে ফিরহাদ হাকিম ইতিমধ্যেই কলকাতার মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য মমতার অনুমতি নিয়েছেন বলে জানা গেছে। কলকাতা বন্দর আসন থেকে পুনর্নির্বাচিত হওয়া ফিরহাদ অতীতে নগরোন্নয়ন, পুরবিষয়ক, আবাসন এবং পরিবহণের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক সামলেছেন। তাঁকে বিধানসভায় তৃণমূলের 'চিফ হুইপ' করা হলেও বিদ্রোহী বিধায়কেরা তা মানতে নারাজ।

অন্যদিকে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় হলেন বাংলার একমাত্র বিধায়ক যিনি টানা ১০ বার বিধানসভা নির্বাচনে জিতে রেকর্ড গড়েছেন। ১৯৯৮ সালের একটি উপ-নির্বাচনে তিনিই ছিলেন তৃণমূলের প্রতীকে জেতা প্রথম বিধায়ক। তিনি কৃষি, সংসদীয় বিষয় এবং বিদ্যুৎ দপ্তরের মতো একাধিক মন্ত্রনালয় সামলেছেন। এছাড়া বজবজের সাতবারের বিধায়ক অশোক দেবও ১৯৯৬ সাল থেকে নিজের আসন ধরে রেখে মমতার প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন।

TMC crisis 06
বুধবার বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কাছে ৬০ জন তৃণমূল বিধায়ক যখন লিখিতভাবে শোভনদেবের পরিবর্তে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থনের কথা জানান, তখনই তৃণমূলের এই আড়াআড়ি বিভাজন জনসমক্ষে চলে আসে।

তবে, বিদ্রোহীরা একটি বিষয়ে অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন; শিউলি সাহার মতো বিদ্রোহী বিধায়কদের স্পষ্ট বক্তব্য, মমতাদিকে বুঝতে হবে যে আমরা তাঁর সাথেই আছি। আমরাই আসল তৃণমূল। কিন্তু যেভাবে আলোচনা ছাড়াই শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম স্পিকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। দল কখনো কোনো একজন ব্যক্তির খামখেয়ালিপনা বা ইচ্ছায় চলতে পারে না। আমি কার কথা বলছি, তা আপনারা ভালো করেই জানেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বিধায়কদের এই ক্ষোভের তির আসলে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে।

বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপকে ঘরের শত্রু বিভীষণ আখ্যা দিয়ে সরব হয়েছেন মমতা শিবিরের কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, বিদ্রোহী বিধায়কদের যদি কোনো ক্ষোভ থাকত, তবে তা দলের অন্দরেই তোলা উচিত ছিল। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আজ যারা ঋতব্রতের পক্ষে সই করেছেন, তাঁদের অনেকেই প্রথমে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার দলিলেও সই করেছিলেন।

TMC crisis 07
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এক প্রবীণ লোকসভা সংসদ সদস্য আক্ষেপ করে জানান, এই ঘটনা শুধু যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তা নয়, এটি মমতার নেতৃত্বের অবমাননা ও অবাধ্যতা। এর থেকে প্রমাণিত হয়, বেশিরভাগ বিধায়ক এখন আর শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে নেই।

তৃণমূলের ভেতরের সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে বিদ্রোহী বিধায়কদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। শুধু বিধানসভা নয়, সংসদের লোকসভা ও রাজ্যসভা দলেও এই একই ধরণের ভাঙন ধরার আশঙ্কা এখন তীব্র। ইতিমধ্যেই বারাসতের বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দলীয় সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া এবং দলের দিকে আঙুল তোলার ঘটনা সেই জল্পনাকেই আরও উসকে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, নিজের তৈরি করা দলেই এখন কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বাংলার অগ্নিকন্যা।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস