নেপালের মধ্য অঞ্চলের রসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে আচমকা সৃষ্টি হওয়া ভয়াবহ ও নজিরবিহীন বন্যার মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঠমান্ডু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট জলবায়ু গবেষক রিজান ভক্ত কায়স্থর প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, উজান এলাকায় একটি বিশাল হিমধস লেন্দে নদীতে ধসে পড়ে স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সাময়িক বাঁধ ভেঙে কোটি কোটি কিউসেক পানি একযোগে নিম্নাঞ্চলে ধেয়ে আসায় এই ধ্বংসাত্মক প্লাবনের সৃষ্টি হয়।
নেপালি সংবাদমাধ্যম 'কান্তিপুর'-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক কায়স্থ জানান, নেপাল ও চীনের গবেষকদের প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য এবং যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে এই চিত্র সামনে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল সীমানার দিক থেকে ধসে পড়া এক প্রকাণ্ড হিমধস বা বিশালাকার বরফখন্ড ধসে লেন্দে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল। এর ফলে উজানে বিপুল পরিমাণ পানি জমতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে পানির প্রচণ্ড চাপে সেই তুষারধসের বাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চলে দুর্যোগ নেমে আসে।
এই ঘটনার পেছনে তিব্বত অঞ্চলের একটি ভূকম্পনের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্লাবনের ঠিক কাছাকাছি সময়ে, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে গোসাইকুণ্ডের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে তিব্বত ভূখণ্ডে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।
অধ্যাপক কায়স্থ জানান, তুষারধসের পাশাপাশি কোনো হিমবাহ হ্রদ বা গ্লেসিয়াল লেক বিস্ফোরণ ঘটেছে কিনা তা নিশ্চিত হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। তবে, অঞ্চলটিতে বেশ কয়েকটি বিশালাকার হিমবাহ হ্রদ থাকায় সেই সম্ভাবনা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, ঠিক একইভাবে ২০২৫ সালের ৮ জুলাইও ভোটেকোশী নদীতে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। সে সময় ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির 'সেনটিনেল' উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণ করে নেপালের জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিভাগ নিশ্চিত করেছিল, রসুয়ার নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার ফলেই লেন্দে নদীতে ওই প্লাবন সৃষ্টি হয়েছিল।
আকস্মিক এই বন্যার পেছনে সাধারণ ভারী বৃষ্টিপাতের ভূমিকা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অধ্যাপক কায়স্থ বলেন, এটি কোনো স্বাভাবিক নদীর প্লাবন ছিল না। বন্যার আকস্মিকতা এবং ধ্বংসাত্মক রূপ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায়, উজানে আটকে থাকা বিশাল পানি হঠাৎ বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড গতিতে উপচে পড়েছে।
জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়া বিভাগ তাদের বিশেষ আপডেটে নিশ্চিত করেছে, মঙ্গলবার বা বুধবার রসুয়া এলাকায় কোনো ভারী বর্ষণ হয়নি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিবাহী মেঘ কেবল বৃহস্পতিবার থেকে জমতে শুরু করার কথা। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টির বদলে জলপ্রবাহ আটকে তৈরি হওয়া জলাধারের বিস্ফোরণই এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মূল কারণ।
নেপালের ন্যাশনাল ডিসাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির মুখপাত্র শান্তি মহত জানান, আন্তর্জাতিক পার্বত্য গবেষণা সংস্থা ‘ইসিমোড’ চীনের সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নদী অবরুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি নেপাল সরকারকে অবহিত করেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হতে কিছুটা সময় লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত ওপার থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে মূল্যায়ন চলছে। তবে সরকারের মূল অগ্রাধিকার এখন দুর্যোগ কবলিত মানুষের দ্রুত উদ্ধার এবং ত্রাণ তৎপরতা নিশ্চিত করা। বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ খুব শীঘ্রই সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট