কোনো আগাম সতর্কতা ছিল না, আকাশে মেঘের ঘনঘটা কিংবা বৃষ্টির ফোঁটাও ছিল না। দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মেই ব্যস্ত ছিলেন নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই যেন নেমে এল কেয়ামতের প্রলয়! তিব্বত সীমান্ত থেকে শত মিটার উঁচু পানির এক বিশাল দেয়াল প্রকাণ্ড গর্জনে ধেয়ে এসে সেকেন্ডের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল আস্ত গ্রাম, বাড়িঘর, সেতু ও শত শত মানুষ।
প্রলয়ঙ্করী এই আকস্মিক বন্যায় রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় অন্তত ১৭৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন তিন শতাধিক ভারতীয়সহ ১৩০০-র বেশি মানুষ।
ঘটনার বীভৎস বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে উঠছেন বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা। রসুয়ার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ঢুঙ্গানা জানান, হঠাৎ পুরো এলাকা বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখতে পান ধুলা আর ধোঁয়া উড়িয়ে নদী দিয়ে ধেয়ে আসছে যেন ১০০ মিটার (প্রায় ১০তলার সমান উঁচু) পানির এক দানবীয় ঢেউ। চোখের পলকে পুরো তিমুরে বাজার এলাকা চোখের সামনে থেকে গায়েব হয়ে গেল, বলেন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে তিনিসহ অনেকে পাশের পাহাড়ি জঙ্গলে আশ্রয় নেন। কাস্টমস চেকপয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা তিন শতাধিক পশুবাহী ট্রাক ও গাড়ি মুহূর্তেই তলিয়ে যায় পানির তোড়ে।
নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারের এক কাপড় ব্যবসায়ী চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। সকালে প্রশাসন থেকে তিব্বত অংশের বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে উঁচুতে পালানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও সময় মেলেনি। চোখের সামনেই কাদা-পানির তোড়ে ভেসে গেছেন তাঁর স্ত্রী ও ১৮ বছর বয়সী সন্তান।
তিব্বতের লেন্দে নদীতে হিমবাহ ভেঙে জমে থাকা পানির কৃত্রিম জলাধার ফেটে যাওয়ার কারণেই এই আকস্মিক দুর্যোগের উৎপত্তি বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। পানি নেমে গেলেও রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জুড়ে রেখে গেছে এক ধ্বংসস্তূপ। নুয়াকোটের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও সেতু কয়েক মিটার পুরু কাদা ও পলিমাটির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক বাড়ির নিচতলা সম্পূর্ণ কাদায় ঢেকে যাওয়ায় সেখানে আটকা পড়া বা চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারে চরম বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলোকে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল নিশ্চিত করেছেন, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যাদের বড় অংশই মানস সরোবরগামী পুণ্যার্থী ছিলেন। নেপাল অংশে সরকারিভাবে ৮২৩ জন নিখোঁজের তালিকা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে চীনের জাইরং কাউন্টিতেও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৮ জনে (যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী)। সব মিলিয়ে উভয় দেশ মিলে প্রায় ১,৩৮৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের খোঁজে কাদা-পানির মধ্যে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে সেনা ও পুলিশ বাহিনী।
বিপর্যয়ের মাত্রা প্রকাশের পরপরই বিশ্বজুড়ে সহানুভূতির ঢেউ উঠেছে এবং সহায়তার আশ্বাস নিয়ে এগিয়ে আসছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্র ৫ লাখ ডলারের জরুরি অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রেড ক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ১৪ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘কোপার্নিকাস’ স্যাটেলাইট সিস্টেম চালু করেছে দুর্ঘটনাকবলিত এলাকার সুনির্দিষ্ট ম্যাপ তৈরিতে সাহায্য করতে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি ওষুধপত্র পাঠিয়েছে এবং ভারত সরকার ইতিমধ্যে ১০ টন জরুরি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে নেপালে।
উদ্ধারকর্মীরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পলিমাটি ও কাদার স্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করে যাচ্ছেন, যদিও প্রতিটি মিনিট পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার আশাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি