নেপালের রসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী বন্যা মূলত তিব্বত থেকে ধেয়ে আসা এক বিশাল পানির ঢলের ফলাফল ছিল। নেপালের হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চ সেন্টারের ‘ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশন’ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রাথমিক কারিগরি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিব্বত সীমানা পেরিয়ে আসা এই পানির প্রকাণ্ড ঢেউ ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নারায়ণী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে চরম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
কারিগরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। এই ভূমিকম্পের ঠিক ১৩ মিনিট পর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে রসুয়ার স্যাব্রুবেসি পানি পরিমাপ কেন্দ্র থেকে সংকেত পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। স্টেশনটি বিকল হওয়ার আগে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে পানির সর্বশেষ উচ্চতা মেপেছিল ১.৬২ মিটার, যেখানে সতর্কতামূলক সীমা ৬ মিটার এবং বিপদসীমা ৯ মিটার।

পরিমাপ কেন্দ্র বিকল হওয়ার ১৫ মিনিট পর, অর্থাৎ সকাল ৯টা ০৫ মিনিটে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তিব্বত অংশ থেকে ভোটেকোশী নদীতে পানির এক বিশাল বন্যা প্রবেশ করেছে।
জরুরি সতর্কবার্তা ও মোবাইল বার্তা প্রেরণ: পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং এবং চিতওয়ান জেলার নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করতে মোবাইল বার্তার মাধ্যমে গণ-যোগাযোগ শুরু করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনতিবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রায় ৬ লাখের বেশি এসএমএস পাঠানো হয়েছিল।
এর কিছুক্ষণ পরই, সকাল ৯টা ২০ মিনিটে বেত্রাবতী নদীর পানি পরিমাপ কেন্দ্রটিও তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। সেখানে পানির শেষ উচ্চতা রেকর্ড হয়েছিল ৩.৫৫ মিটার।

গতিপথ ও বিপদসীমা অতিক্রমের সময়রেখা: পূর্বাভাস কেন্দ্র থেকে বলা হয়, সকাল ১০টা ২৮ মিনিটের মধ্যে বন্যার ঢেউ ধাদিং-গালছি এলাকায় পৌঁছাবে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুগলিন অতিক্রম করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এরপর পৃথ্বী হাইওয়ে, মুগলিন-নারায়ণঘাট সড়ক এবং ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বসতিগুলোর মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়।
সকাল ১১টা ২৬ মিনিটে ফুরকে (মালেখু) পরিমাপ কেন্দ্রে নদীটির পানির স্তর বিপদসীমা অতিক্রম করে। তার ঠিক ১৭ মিনিট পর, সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে পানির প্রচণ্ড তোড়ে ফুরকে নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভেসে যায়। সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে বন্যা মালেখু এলাকায় আছড়ে পড়ে।ৱ

দুপুর ১টায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে পানির ঢল মুগলিন অতিক্রম করে ফেলেছে। তখন দেবঘাট পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়া হয়।
দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে দেবঘাটে নদীর পানির স্তর ছিল ৪.৭৬ মিটার, যা বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মূল ঢল পৌঁছালে ৮ মিটারে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। দুপুর ২টা ১৪ মিনিটে কালিক খোলা স্টেশনে পানি বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায় এবং নদীর পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা ১২.৩ মিটারে গিয়ে ঠেকে।

পানির চূড়া স্পর্শ ও নেমে যাওয়া: বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বন্যা নারায়ণী-দেবঘাট অঞ্চলে পৌঁছে যায় এবং নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। বিকেল ৪টায় দেবঘাটে পানির স্তর সর্বোচ্চ ৬.৫৭ মিটারে পৌঁছে চূড়া স্পর্শ করে এবং এরপর থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটের মধ্যে দেবঘাটে নদীর পানি কমে ৪ মিটারে নেমে আসে।
১০ ঘণ্টার ধ্বংসলীলা ও বিপুল পানির চাপ: কারিগরি মূল্যায়নে অনুমান করা হয়েছে, এই আকস্মিক বন্যায় নদী অববাহিকায় অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ঘনমিটার পানি প্রবেশ করেছিল।

সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূকম্পন রেকর্ড হওয়া থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে দেবঘাটে পানি নামতে শুরু করা পর্যন্ত- মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে ভোটেকোশী, ত্রিশূলী, মুগলিন ও মালেখু হয়ে দেবঘাট পর্যন্ত একের পর এক নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভাসিয়ে নিয়ে এই প্রলয়ঙ্করী বন্যা পথ অতিক্রম করে।
বন্যার তোড়ে পরিমাপ কেন্দ্রগুলো একের পর এক ধ্বংস হয়ে গেলেও প্রাথমিক সতর্কবার্তা পাঠানোর কারণে বহু মানুষকে আগেই নিরাপদ স্থানে সরানো সম্ভব হয়েছিল।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
