হিমালয়ে বিধ্বংসী বন্যার নেপথ্যে জলবায়ু পরিবর্তন!

বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন উচ্চ-পার্বত্য অঞ্চলের পাথর ও বরফের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মতো পরিবেশ তৈরি করছে, যা নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে এই সপ্তাহে ঘটে যাওয়া প্লাবনের মতো প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ বন্যায় ইতোমধ্যেই ২৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

একটি বিশাল কাদা ও পাথরের পাহাড় ধসে পড়ার পর পার্বত্য নদীতে সৃষ্টি হওয়া ক্যাটাষ্ট্রফিক বন্যায় বিভিন্ন শহর ও উপত্যকা প্লাবিত হওয়ার এক দিন পর, বৃহস্পতিবার কর্তৃপক্ষ জানায় যে নিখোঁজ প্রায় ১,৫০০ জনের মধ্যে অন্তত ৮০০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।

Nepal Flood 06
‘আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ড’-এর ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তন এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করছে যা উচ্চ-পার্বত্য অঞ্চলের পাথর ও বরফকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তিনি জানান, এর ফলে চলতি সপ্তাহে আমরা যে ধরণের ধস এবং একের পর এক ক্রমান্বয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখতে পেলাম, তার পুনরাবৃত্তি এখন আরও ঘন ঘন ঘটবে।

বিপর্যয়ের মূল কারণ এখনো বিশ্লেষণাধীন: বুধবারের এই বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সম্ভবত নেপালের লাংটাং লিরুং চূড়ার উত্তর ঢালে একটি বিশাল বরফ-পাথরের ধস থেকে শুরু হয়েছিল, যা তিব্বতের লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পতিত হয়।

Nepal Flood 05
শুরুর এই পাহাড় ধসের ফলে সীমান্তজুড়ে তৈরি হওয়া বহুমাত্রিক দুর্যোগের কারণে ছয়টি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জাইরং বন্দর বাণিজ্য হাবের পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি এটি ভারতীয় সীমান্তের কাছে প্রায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি নিম্নাঞ্চলের নদীর গতিপথ বদলে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনকে বুধবারের এই ধসের একমাত্র বা তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে সতর্ক করলেও তারা বলছেন, ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হিমবাহের গলে যাওয়া সম্ভবত এই বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

Nepal Flood 07
পরিবেশ ও জলবায়ু বিজ্ঞানী সাইমন কক্স আরও বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন খাড়া পাহাড়ি ঢালে বরফের ধারক ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, গলিত পানির পরিমাণ বাড়াতে পারে এবং বরফ জমা, গলা ও বৃষ্টির স্বাভাবিক ধারায় পরিবর্তন আনতে পারে। আর এসব উপাদান পাহাড়ের ঢালকে দুর্বল করে দিয়ে কিছু কিছু জায়গায় বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া একই ধরনের বিপর্যয়: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে একই ধরনের বিনাশী ঢল নেমেছিল, তবে সেগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার।

Nepal Flood 08
এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জাইরংয়ে ঘটে যাওয়া বন্যা, ২০২৪ সালে শেপা গ্রাম থামে-তে গ্লেসিয়াল লেক বিস্ফোরণ এবং তার আগে ২০২৩ সালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়। হিন্দুকুশ পর্বতমালা জুড়ে বন্যা, ভূমিধস, হিমধস এবং খরার মতো দুর্যোগগুলোর প্রকোপ ও তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নেপালভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা 'আইসিআইএমওডি' সতর্ক করে জানিয়েছে, পানি, মাটি ও আবহাওয়া মণ্ডলে ত্বরান্বিত এই পরিবর্তনগুলো এই অঞ্চলের মানুষের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংস্থার জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজম বলেন, পর্বতমালার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ভূপৃষ্ঠের বরফাবৃত অংশ (ক্রায়োস্ফিয়ার) আগের তুলনায় অনেক বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।

Nepal Flood 09
তিনি মনে করেন, অতিরিক্ত বরফ গলা এবং এর সাথে ভূকম্পনজনিত তৎপরতা যুক্ত হয়ে প্রাথমিক বরফ-পাথরের ধসটি তৈরি করেছিল, যা পরে বুধবারে নিম্নাঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়।

দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা অত্যন্ত হতাশাজনক: জাতিসংঘের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে নেপালের তুষারাবৃত পর্বতগুলো তাদের বরফের আস্তরণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও যুক্ত করা হয়, নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় শেষ দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুত গতিতে গলে গেছে।

হংকং সিটি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেঞ্জামিন হর্টন বলেন, বুধবারের এই বিপর্যয়টি একটি 'কম্পাউন্ড ইভেন্ট' বা যৌগিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্লাসিক উদাহরণ হতে পারে।

Nepal Flood 01
তিনি ব্যাখ্যা করেন, যখন একটি ভূমিকম্পের সাথে জলবায়ু-চালিত পরিবর্তনসমূহ, যেমন হিমবাহের ক্ষয়, পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত অঞ্চল গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা একত্রিত হয়, তখন তা একক কোনো কারণের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে।

হর্টন আরও বলেন, উচ্চ-পার্বত্য অঞ্চলের দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য এই ক্রমান্বয়ে ঘটতে থাকা ঝুঁকিসমূহ বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স