হিমালয়ের কোলঘেঁষা গিরোং স্থলবন্দরটি এক সময় ছিল চীন ও নেপালের সীমান্ত যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের গমগমে পদচারণায় প্রতিদিন মুখরিত থাকত দুই দেশের ট্রানজিট পয়েন্টটি। কিন্তু আজ তা এক বিরান ও ধূ ধূ পাথুরে প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।
২৬ আগস্ট পাহাড় বেয়ে নেমে আসা বিশাল কাদার ধস ও প্রলয়ঙ্করী বন্যায় মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সীমান্ত চৌকিটি। সুবিশাল পাঁচতলা প্রশাসনিক ভবন, সুপারমার্কেট, ট্রাভেল এজেন্সি কিংবা নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু, কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। রয়ে গেছে শুধু পাথরের স্তূপ, থকথকে কাদা আর ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া প্রিয়জনদের জন্য স্বজনদের এক বুক হাহাকার।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র এক প্রতিনিধি দল গত রোববার চীন সরকারের কঠোর তত্ত্বাবধানে দুর্গম এই এলাকা পরিদর্শন করে ধ্বংসলীলার রোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরেছে।
চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেন ওয়েই জানিয়েছেন, সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী শুধু চীনের অংশেই ৪৩ জনের প্রাণহানি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় ৫১৯ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। আর নেপাল ও চীন উভয় সীমান্ত মিলিয়ে এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাতাসে কেবল ভারী ধূলিকণা আর ঘন কুয়াশার আস্তরণ। প্রলয়ঙ্করী ধসে ধুলোয় মিশে গেছে বিলাসবহুল পাঁচতলা সীমান্ত ইমিগ্রেশন ভবনটি। উদ্ধারকারী দলের কমান্ডার ঝাং জিয়াওজুন এক মর্মস্পর্শী বর্ণনায় বলেন, আমরা খুঁড়ে শুধু ভবনের ভিত্তি বা কংক্রিটের মূল অংশটুকু পেয়েছি। ওপরের পুরো কাঠামোই কাদার তোড়ে ভেসে গেছে। এতগুলো তাজা প্রাণ এক নিমেষে নিঃশেষ হয়ে গেল, তা ভাবতেও বুক কেঁপে ওঠে। ধসে পরা কাদার ওপর বাতাসে উড়ছে লাল-সোনালি রঙের একটি চীনা পতাকা এবং নিহতদের স্মরণে বসানো হয়েছে প্রায় একশত হলুদ ফুলের একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ।
পাহাড় ভেঙে সৃষ্ট এই বিপর্যয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানো অত্যন্ত দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলের প্রধান ইয়াং কিছিয়াও জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে বিশাল আকৃতির পাথর, মিটার মিটার পুরু কাদা এবং অনবরত গৌণ ভূমিধসের চরম ঝুঁকি রয়েছে।
এমনকি পাহাড়ি নদীতে কাদা ও পাথর জমে তৈরি হওয়া কৃত্রিম 'ব্যারিয়ার লেক' বা অস্থায়ী হ্রদ যেকোনো মুহূর্তে উপচে নতুন বন্যার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত বুধবার ঘটনার পুরো সাত দিন পর সড়ক যোগাযোগ সচল হওয়ার পরই শুধু সেখানে ভারী এক্সক্যাভেটর ও সামরিক উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে পেরেছেন।
বিপর্যয়ের পর নেপাল সরকার প্রতিনিয়ত উদ্ধার ও হতাহতের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করলেও, চীনের তিব্বত প্রশাসন প্রথম দিকে নিখোঁজদের তালিকা প্রকাশে ধীরগতি নীতি গ্রহণ করেছিল। এতে নিখোঁজ দেশি-বিদেশি স্বজনদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে রোববার সন্ধ্যায় গিরোং শহরে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমের একের পর এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হন।
তিব্বত জননিরাপত্তা দপ্তরের নির্বাহী উপ-পরিচালক পু ওয়েইডং জানান, উদ্ধার হওয়া খণ্ডবিচ্ছিন্ন দেহাবশেষ শনাক্ত করতে ৬০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ এবং ৩টি বিশেষ ল্যাব সার্বক্ষণিক কাজ করছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ এবং ইমিগ্রেশন রেকর্ড বিশ্লেষণ করে নিহতদের পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
পাশাপাশি তিব্বত পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ইয়াং লাহং জানান, নিখোঁজ সব বিদেশি নাগরিকদের তালিকা তাদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসে হস্তান্তর করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ভয়াবহতা যে কতটা রূপ ধারণ করতে পারে, গ্যিরোং পোর্টের এই করুণ চিত্র এখন বিশ্ববাসীর সামনে এক নির্মম সতর্কবার্তা হয়ে রইল।