নেপালে বানের পানি নেমে গেলেও দুর্যোগের ক্ষত শুকায়নি!

নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোট ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে আগস্ট মাসের শেষ দিকে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও কাদা-ধসের পানি নেমে গেলেও দুর্যোগের আসল ক্ষত এখনো শুকায়নি। বিশেষ করে বন্যার করাল গ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া, স্বজন হারানো কিংবা ভয়াবহ ধ্বংসলীলার প্রত্যক্ষদর্শী হাজার হাজার শিশুর মনে এখন বাসা বেঁধেছে এক গভীর মানসিকভাবে তাড়া করে ফেরা আতঙ্ক। স্বজন হারানোর বেদনা, মাঝরাতে আঁতকে ওঠা আর তীব্র ঘুমের ব্যাঘাতের মতো মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

নুওয়াকোটের ১৬ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী সমীক্ষা ডাঙ্গলের ঘটনাটি তেমনই এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। গত ২৬ আগস্ট স্কুলে বন্যার সতর্কতা পেয়ে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে জানতে পারেন তাঁর বোন, ভাই ও দুই ফুফু ঢলের তোড়ে ভেসে গেছেন। সেই স্মৃতি আজও তাকে ঘুমাতে দেয় না। অতিরিক্ত মানসিক চাপে মাইগ্রেনের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।

Nepal Flood 05
অন্য দিকে, রসুয়ার তিমুরে এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ২১ মাস বয়সী এক শিশুর মা কারসাং তামাং জানান, বন্যার বিকট শব্দে পালিয়ে রক্ষা পাওয়ার পর থেকে এখন আকাশে হেলিকপ্টারের সামান্য শব্দ শুনলেও শিশুটি আতঙ্কে কেঁদে ওঠে। ট্রাইবুভান ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরেক ৬ বছরের শিশু উদ্ধার পাওয়ার পরও কিছুদিন কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।

ক্ষতির ভয়াবহ পরিসংখ্যান: ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে প্রায় ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, তিনটি জেলার ১৯টি স্কুলের কমপক্ষে ৬,৯০১ জন শিক্ষার্থী সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। শুধু রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলাতেই ভোটকোশী নদীর বন্যায় এখনো ৬২২ জন শিক্ষার্থীর কোনো খোঁজ মেলেনি।

শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ: মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা তীব্র মানসিক চাপের ফলে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি এবং গভীর দুশ্চিন্তায় ভুগছে। দীর্ঘস্থায়ী হলে তা 'পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার' (পিটিএসডি) বা চরম বিষণ্ণতায় রূপ নিতে পারে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিভিতে বারবার ধ্বংসলীলার দৃশ্য দেখা শিশুরাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

Nepal Flood 04
অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রথম দিকে শিশুরা চরম ভয়ে গুটিয়ে থাকলেও স্বেচ্ছাসেবকদের গল্প বলা, ছবি আঁকা এবং খেলার ছন্দে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সরকারের পাশাপাশি সাহযাত্রী নেপাল, ন্যাশনাল চাইল্ড রাইটস কাউন্সিল এবং স্থানীয় পৌরসভা যৌথভাবে সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক সেবা প্রদান করছে। যেসব শিশু বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য বিদুর পৌরসভা দুটি আবাসিক স্কুলে থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে।

মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে এসব শিশু যেন মানবপাচার, শিশুশ্রম, শোষণ বা শিশু নির্যাতনের শিকার না হয়, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। একই সাথে, ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের ছবি বা গোপনীয় তথ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্য নেপাল পুলিশ ও চাইল্ড রাইটস কাউন্সিল কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে, যা তাদের আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বর্তমানে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি শিশুদের ভয় কাটিয়ে আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করাই নেপালের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।