কন্টেইনারের খাঁচায় বন্দি পেশোয়ার, থমথমে খাইবার পাখতুনখোয়া

দশক ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সহিংসতার আগুনে পুড়লেও রাজনৈতিক স্থায়িত্বের এক অনন্য দুর্গ ছিলো খাইবার পাখতুনখোয়ার রাজধানী পেশোয়ার। কেন্দ্রের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিংবা ইসলামাবাদ অভিমুখে সুবিশাল লংমার্চ, সব ঝড়ঝাপটার মধ্যেও অন্তত এক ধরনের আপেক্ষিক স্থিরতা বজায় থাকত এই শহরে।

কিন্তু রোববার সকালে গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর নিমেষেই বদলে গেছে সেই পরিচিত দৃশ্যপট। শনিবার রাতে যে পেশোয়ারে মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে রাস্তাঘাট ভেসে গিয়েছিল, রোববারের একফালি মিষ্টি রোদ সেখানে নিয়ে আসেনি কোনো স্বস্তি; বরং নিয়ে এসেছে এক অশুভ ও দমবন্ধ করা শঙ্কা।

Peshawar Container 04
রোববার সকালে ঘুম থেকে উঠে মুঠোফোনে হাত দেওয়া মাত্রই নগরবাসী বুঝতে পারেন অশুভ কিছু ঘটতে চলেছে—ফোনে কোনো সিগন্যাল নেই! পিটিআই’র বিক্ষোভের কারণে কয়েকদিন আগেই টানা ৪৮ ঘণ্টা মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন ছিল, এবার সেই একই ব্ল্যাকআউটের কবলে পুরো শহর।

ঘরের বাইরে বের হতেই দেখা মেলে, পেশোয়ার বাস র‍্যাপিড ট্রানজিটের সব স্টেশন তালাবদ্ধ। জিটি রোডের ওপর শিপিং কন্টেইনারের সুবিশাল প্রাচীর তুলে ফেরদৌস চকে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে মোতায়েন রয়েছে সশস্ত্র পুলিশের বিশাল বহর।

Peshawar Container 02
মালিক সাদ শহীদ চকের বন্ধ দোকানপাটের সামনে বসে অলস সময় পার করছেন শত শত দাঙ্গা পুলিশ। সংবেদনশীল এলাকা যেমন, ফ্রন্টিয়ার কোর নর্থের সদর দপ্তর ‘বালা হিসার দুর্গ’ এবং খাইবার পাখতুনখোয়া অ্যাসেম্বলি সংলগ্ন সুরেই চকের সব গেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রেড জোনের রাস্তাগুলোতে সাঁজোয়া যান, কয়েদি ভ্যান, পুলিশের ট্রাক চলাচলের দৃশ্য পুরো শহরে যুদ্ধের মতো এক থমথমে আবহ তৈরি করেছে।

আইনপ্রণেতাদের আবাসন বা এমপিএ হোস্টেলের সামনে পুলিশি বাধায় বাধ্য হয়ে গলিঘুঁজি দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের। সরকারের মূল প্রাণকেন্দ্র 'সিভিল সেক্রেটারিয়েট' সম্পূর্ণ খাঁ খাঁ করছে; মুখ্য সচিবের দপ্তরের বাইরে হাতেগোনা কয়েকটি গাড়ি ছাড়া কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে মন্ত্রী ও গভর্নরের সরকারি বাসভবনের সামনে নিরাপত্তা এতটাই কড়া যে সাধারণ মানুষকে দাঁড়াতেই দেওয়া হচ্ছে না। বিকেলে মোবাইল নেটওয়ার্কের সাথে সাথে ইন্টারনেট পরিষেবাও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

Peshawar Container 03
বছরের পর বছর ধরে পেশোয়ার থেকে ওঠা রাজনৈতিক মিছিল আটকে দিতে ইসলামাবাদকে কন্টেইনার দিয়ে দুর্গ বানাতে দেখা গেছে। কিন্তু এবার রাজনৈতিক ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, কেন্দ্র থেকেই কন্টেইনার পাঠাল পেশোয়ারে! নাগরিক স্বাধীনতার অধিকার এক নিমেষে কীভাবে উবে যায়, তা আজ পেশোয়ারের প্রতিটা অলিগলিতে স্পষ্ট। এই লোহার কন্টেইনার আর জরুরি অবস্থার অবরুদ্ধ শৃঙ্খল কতদিন পেশোয়ারকে বন্দি করে রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: দ্য ডন