মহান একুশের সেই মহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় জাতি

রক্তের বিনিময়ে কেনা বর্ণমালা! মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা। তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!

সময়ের পরিক্রমায় দুয়ারে আবারও আরেকটি মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা, তার পরেই মহান একুশের প্রথম প্রহর।

যাদের রক্তের বিনিময়ে কেনা হয়েছিলো বাংলা ভাষা, সেই সব ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত জাতি। প্রস্তুত স্মৃতির মিনার। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সব আয়োজনে চলছে শেষ মুহূর্তের ছোঁয়া।


এরই মধ্যে আলপনা, দেয়ালচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে শহীদ বেদী। সিসিক্যাম, ডগ স্কোয়াড, হেলিকপ্টার টহল, বোম্ব স্কোয়াড নিয়ে নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত র‍্যাবও। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, করোনার বিধিনিষেধের কারণে শ্রদ্ধা জানানো মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনার নিয়ম মানতে কড়া হবেন তারা। 

ইতিহাস বলে, বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে, দিতে হয়েছে জীবন। পিচঢালা কালো পথ রক্তে রাঙানোর বিনিময়ে অর্জিত এই ভাষা; প্রাণের ভাষা, মায়ের ভাষা 'আমরি বাংলা ভাষা'।

আর সেই ইতিহাসের আলো দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বকে করেছে আলোকিত, যে আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে বীর বাঙালীর রক্ত দানের বীরত্বগাঁথা কতকথা। 

পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার বিরল সম্মান, যা ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপি পালিত হয়ে থাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে।

যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই মর্যদা সেই মহাৎপ্রাণ আবুল বরকত, রফিক, শফিক, জাব্বার, সালামসহ নাম না জানা ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত জাতি। 

বাঙালির শোক ও গর্বের শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ বেদী আর রাস্তা যখন আলপনার রঙে রাঙা, তখন দেয়ালগুলো সেজে উঠেছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।

শহীদ মিনার এলাকার সব দেয়াল ধুয়েমুছে রঙ করা হয়েছে, আলপনা এঁকেছেন শিল্পীরা, লেখা হয়েছে ভাষা আন্দোলনের স্লোগান, গানের কলি, ভাষা নিয়ে লেখা কবিতার পঙক্তি-শ্লোক।

দেয়াল লিখন, আলপনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। তার নেতৃত্বে শিক্ষার্থী ও চিত্রশিল্পীরা দেয়ালিকার কাজ করেন।

অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, সাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিচালিত মানবগোষ্ঠী এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান। পাকিস্তান আমলে শহীদ মিনার বানানো হয়েছিলো বলে এটিকে একটি ইসলামী পরিচয় দিতে ওই নির্দিষ্ট সম্প্রদায় মরিয়া হয়ে ওঠে। আমাদের সংস্কৃতিকে ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার অংশ হিসেবে আলপনা ও দেয়াল লিখনের এই পদক্ষেপ।

করোনাকালে আরো একটি মহান শহীদ দিবস। তাই স্বাস্থ্যবিধিটা ষোল আনাই মানতে বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ ও ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ দুজন ফুল দিতে বেদিতে যেতে পারবেন। পাশাপাশি সবাইকে করোনার টিকার সনদ নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী আরো জানিয়েছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ- এই তিনটি বিশেষ অর্জনকে এবারে মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনকে সাজানো হচ্ছে।  


এদিকে, দিনটিকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতেও নেয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি। নিরাপত্তা নিশ্চিতে শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকায় লাগানো হয়েছে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। 

পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বসানো হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। এছাড়াও রেগুলার ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং চালাচ্ছে র‍্যাব।

রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে আসেন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। 

তিনি বলেন, যতটুকু দরকার তার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শহীদ মিনার কেন্দ্র করে কোনোধরনের অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণে র‍্যাবের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

র‍্যাব প্রধান জানান, যেকোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্পেশাল ফোর্স রাখা হয়েছে।

শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীরা যেন টিজিংয়ের শিকার না হন, সে বিষয়ে বিশেষ নজরদারি থাকবে। শিশুদের জন্য নিরাপত্তা বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।

তিনি জানান- ভার্চুয়াল জগতে গুজব রোধে র্যা বের সাইবার মনিটরিং টিম কাজ করছে। কোন অসামঞ্জস্য চোখে পড়লে জরুরি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে ০১৭৭৭৭২০০২৯ নম্বরে।

একাত্তর/এআর