কতটা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় মোখা?

গভীর সাগরে ছয়দিন ধরে তীব্র শক্তি সঞ্চয় করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখা। 

বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিস ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যে পূর্বাভাস দিচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তা যদি সত্যি হয়, তাহলে দেশের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হতে যাচ্ছে মোখা। 

পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রায় ৫০০ কিলোমিটার ব্যাসের মহাপরাক্রমশালী এই ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র রোববার সকালেই উপকূলের দারপ্রান্তে এসে যাবে। দুপুর নাগাদ কক্সবাজার উপকূলের পাশ ঘেঁষে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। 

ঘূর্ণিঝড়ের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে শনিবার আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬০৫ কিলোমিটার এবং কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল।  

ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে ঘণ্টায় ১৯ থেকে ২২ কিলোমিটার গতিতে। এই ঝড়ের কেন্দ্রে যে প্রবল ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়েছে তা ভাবিয়ে তুলেছে অনেককেই। 

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, মোখার কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাতাসের একটানা ঘূর্ণন গতি রয়েছে ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার, যা দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। 


আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা আকু ওয়েদারের হিসাবে, শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় বাতাসের একটানা ঘূর্ণন গতি ছিল ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার, যা দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ ২৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। 

এই গতি সামান্য কমলেও রোববার দুপুর বারোটায় ২৩২ থেকে ২৮৯ কিলোমিটার গতি থাকবে বলে আকুর পূর্বাভাস। 

বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিস এই ঘূর্ণিঝড়কে অতি প্রবল বা ভেরি সিভিয়ার উল্লেখ করেছে। আকু ওয়েদার এটাকে ‘এক্সট্রিমলি সিভিয়ার’ বা চরম প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। 

বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদরাও ঝূর্ণিঝড় মোখাকে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে দেখছেন। দেশের অন্যতম বিধ্বংসী ঝড় সিডরের মতোই মোখাকে শক্তিশালী মনে করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মিন্ট সে দেশের আবহাওয়া অফিসের সূত্র উল্লেখ করে লিখেছে, প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশে দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে মোখা। 

শনিবারই কক্সবাজার জেলাকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় এনেছে আবহাওয়া অফিস। চট্টগ্রাম ও পায়রা বন্দরসহ উপকূলীয় আরও ১১ জেলাকে রাখা হয়েছে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায়। 

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা এবং কাছাকাছি দ্বীপ ও চরগুলোর নিচু এলাকা ৮ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। বাকি ১০ জেলায় পাঁচ থেকে সাত ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। 

অতি ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধস হতে পারে।

বাংলাদেশের পাঁচটি গতিময় ঘূর্ণিঝড়

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৯৬০ সাল থেকে মোট ৩৩টি ঘূর্ণিঝড়ের যে তালিকা দেয়া হয়েছে, সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি গতির পাঁচটি ঝড় নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 


গতিময় এই পাঁচটি ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের সর্বোচ্চ ঘূর্ণন গতি ছিল ঘণ্টায়  ২২০ থেকে ২৩২ কিলোমিটারের মধ্যে। 

# ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৪ কিলোমিটার, যা চট্টগ্রাম অঞ্চলে আছড়ে পড়ে। 

# ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামে আছড়ে পড়া আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার। 

# ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল অতিক্রম করা ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটার।

# ১৯৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৩২ কিলোমিটার, যা সীতাকুণ্ডে অঞ্চলে আছড়ে পড়ে। 

# ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর খুলনা-বরিশাল উপকূলের বলেশ্বর নদীর কাছে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২৩ কিলোমিটার বাতাসের গতিবেগ দিয়ে আছড়ে পড়ে।

সর্বোচ্চ জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করা পাঁচটি ঘূর্ণিঝড়


# ১৯৬০-প্রবল ঘূর্ণিঝড়- চট্টগ্রাম- জলোচ্ছ্বাস ২০ ফুট 

# ১৯৬৬-প্রবল ঘূর্ণিঝড়- চট্টগ্রাম- জলোচ্ছ্বাস ২০-২২ ফুট

# ১৯৭০-প্রবল ঘূর্ণিঝড়- চট্টগ্রাম-জলোচ্ছ্বাস ১০-৩৩ ফুট

# ১৯৯১-প্রবল ঘূর্ণিঝড়- চট্টগ্রাম-জলোচ্ছ্বাস ১২-২২ ফুট

# ২০০৭-প্রবল ঘূর্ণিঝড়-খুলনা-বরিশাল উপকূলের বলেশ্বর নদীর কাছে-জলোচ্ছ্বাস ১৫-২০ ফুট

ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ মোকাবেলায় প্রস্তুতি

কক্সবাজার জেলায় ৫৭৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলার উপকূলীয় এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের ৮ হাজার ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। জরুরী ত্রাণ হিসেবে ১০ লাখ ৩০ হাজার নগদ টাকা, ৪৪০ টন চাল, ৭ টন শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি ও ১৯৪ বান্ডিল ঢেউ টিন মজুত রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম শহর ও বিভিন্ন উপজেলা মিলিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে ১ হাজার ৩০টি আশ্রয়কেন্দ্র। জেলায় ৮ হাজার ৮৮০ জন সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তত রাখা হয়েছে।  

ফেনী জেলার সোনাগাজী উপকূলীয় অঞ্চলে ৪৩টি আশ্রয়ণকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ১৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে রেডক্রিসেন্ট, সিপিপিসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের।  

নোয়াখালী জেলায় মোট ৪৬৩টি আশ্রয়কেন্দ্র ও তিনটি মুজিব কিল্লা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুত রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৭ হাজারের মত স্বেচ্ছাসেবী। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে ১১১টি মেডিক্যাল টিম। এছাড়া, রেডক্রিসেন্ট ও সিপিবির ৫ শতাধিক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীও দুর্যোগকালীন সময়ে সেবা দেয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। 

লক্ষ্মীপুর জেলায় ৬৪টি মেডিকেল টিম ও ১৮৫টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। দুর্যোগকালীন ত্রাণ তহবিলে ৮ লাখ ১২ হাজার টাকা ও ৪২০ টন চাল রয়েছে। এছাড়া সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূর্যোগকালীন কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

বরগুনা জেলায় প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও ৬৪২ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে প্রশাসন। জেলায় ২৯৪ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা হয়েছে। দুর্যোগ পরবর্তী জরুরি ত্রাণ বাবদ ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ১৪২ বান্ডিল ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণ ব্যয় বাবদ ৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা, ২ হাজার কম্বল ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার মজুদ রয়েছে।  

এছাড়া মোংলা সমুদ্র বন্দর এলাকায় ৭টি বিদেশী জাহাজ এবং ১১টি দেশী জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ ও জাহাজের পাশে অবস্থান করা পণ্য নিতে আসা ছোট লাইটার, বার্জ ও কোস্টারগুলোকেও নিরপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। 


একাত্তর/আরবি