হত্যা,
ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩
সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে জামায়েতের তখনকার নায়েবে আমির সাঈদীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই বছরের ২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
২০১১ সালের ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০ অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়। যার মধ্যে দুটি হত্যাকাণ্ডও রয়েছে।
এর মধ্যে সদর থানার চিতলিয়া গ্রাম থেকে দুজনকে অপহরণের পর একজনকে হত্যা এবং ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় আরেকজনকে গুলি করে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় সাঈদীকে।
এছাড়া পারেরহাটে লুটপাট, ভাদুরিয়া গ্রামে অপহরণ, নির্যাতন, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ইন্দুরকানি থানার টেংরাখালী গ্রামে অপহরণ ও নির্যাতন, সদর থানার হোগলাবুনিয়ায় ও পারেরহাট বন্দরে চার নারীকে ধর্ষণ এবং হিন্দুদের ধর্মান্তরে বাধ্য করার ছয়টি ঘটনায় সাঈদীর জড়িত থাকার অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত হয়।
তবে দুটি ঘটনায় ফাঁসির আদেশ হওয়ায় এসব অভিযোগে সাঈদীকে আর কোনো দণ্ড দেয়া হলো না বলে উল্লেখ করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের রায়ে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ প্রমাণিত
# ১৯৭১ সালের ৭ মে সাঈদী পাকিস্তানি বাহিনীকে পারেরহাট বাজারে নিয়ে এসে সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষদের বাড়িঘর ও দোকান-পাট চিনিয়ে দেন। পরে অন্যদের সঙ্গে এ সকল বাড়ি ও দোকানে লুটপাট চালায়। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে সংগঠিত এই সব কার্যক্রম মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
# ৮ মে দুপুরে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা পাকিস্তান সেনাদের সঙ্গে নিয়ে সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম খানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে হানা দেন। সেলিমকে আটক করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন সাঈদী। বাড়ি লুটপাট করার পর যাওয়ার আগে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
# একইদিন বেলা ৩টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সহযোগীরা পাক বাহিনীর সহায়তায় সদর থানার চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারীর বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিমসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেনা ক্যাম্পে ফেরার পথে সাঈদীর প্ররোচণায় ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়। মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে সাঈদী ও অন্যদের আগুনে পারের হাট বন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাঈদী সরাসরি অপহরণ, খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন।
# ১৯৭১ সালের ২ জুন ওইদিন সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার ২৫টি ঘরে আগুন দেয়। একজনকে হত্যা করা হয়। সাঈদী বাড়িঘর পোড়ানো, হত্যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন।
# ২ জুন সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটি ইন্দুরকানি থানার টেংরাখালী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে যায়। সেখানে সাঈদী মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুলের বড় ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নির্যাতন করে।
# মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের রাজাকার বাহিনী সদর থানার হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়া আক্রমণ করে। সেখানে শেফালী ঘরামি ও মধুসুদন ঘরামি ছাড়া বাকিরা সবাই পালিয়ে যায়। কয়েকজন রাজাকার শেফালী ঘরামিকে ধর্ষণ করে। সাঈদী এই ধর্ষণে বাধা দেননি। পরে তারা এই হিন্দুপাড়ার ঘরে আগুন দিয়ে দেয়।
# মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাঈদীর নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকার দল পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোনকে অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাদেরকে আটকে রেখে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে ছেড়ে দেয়।
# মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাঈদী জোর করে মধুসুদন ঘরামী, কৃষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হাওলাদার, শান্তি রায়, হরি রায় জুরান, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্যরাণী ও কমল রাণীসহ ১০০/১৫০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তর করেন।
একাত্তর/কেএসএইচ