আইন ভঙ্গকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা, নির্বাচন আইনের সংস্কার করে সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা তৈরি করা এবং দেশের ব্যাপক উন্নয়নের পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ‘স্যাংশন’ দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেছেন, ‘হঠাৎ এই ধরনের একটা স্যাংশন দেয়ার যৌক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না।’
জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেছেন শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারটি শনিবার প্রকাশ করেছে ভয়েস অব আমেরিকা।
সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া সম্প্রতি ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের বিষয় এবং এর আগে দেয়া র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর স্যাংশন দেয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনার কাছে জানতে চান ভয়েস অব আমেরিকার সাংবাদিক।
জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার এটাই প্রশ্ন যে, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ তারা ভিসা স্যাংশন দিতে চাচ্ছে কেন? ‘আর মানবাধিকারের কথা যদি বলেন, ভোটের অধিকারের কথা যদি বলে, তাহলে আমরা আওয়ামী লীগই এ দেশের মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করেছি।’ ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের দলের নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যাতে হয়, তার জন্য যত রকমের সংস্কার দরকার, সেটা আমরাই তো করেছি। এক্ষেত্রে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোট কেন্দ্রে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের ব্যবহার এবং মানুষকে ভোটের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার বিষয় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দিব- এই স্লোগান তো আমার দেয়া,’- এ তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি মানুষকে এভাবেই উদ্বুদ্ধ করেছি।’ আর বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন থাকায় তখন কেমন ভোট হতো তাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে মিলিটারি ডিক্টেটররা বেশিরভাগ সময় দেশ শাসন করেছে। মানুষের তো আর ভোট দেয়া লাগেনি। তারা (শাসকরা) ভোটের বাক্স ভরে নিয়ে জাস্ট রেজাল্ট ঘোষণা দিয়েছে।‘এরই প্রতিবাদে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করে আজকে আমরা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশে নিয়ে আসতে পেরেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন মানুষ তার ভোটের অধিকার নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। সেটা আমরা করেছি। সেই ক্ষেত্রে হঠাৎ এই ধরনের একটা স্যাংশন দেয়ার যৌক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না।’
সাক্ষাৎকারে বর্তমান সরকারের সময় ভোটের অধিকারে নেয়া পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের আইন লঙ্ঘনকারীদের বিচারের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী, আমার কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সে র্যাব হোক, পুলিশ হোক বা যেটাই হোক, কেউ যদি কোনোরকম অন্যায় করে আমাদের দেশে কিন্তু তাদের বিচার হয়। এই বিচারে কিন্তু কারো রেহাই পায় না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে অনেক কাজ তারা অতিরিক্ত করতে পারে। কিন্তু করলে সেটা আমাদের আইনেই বিচার হচ্ছে। যেখানে এ রকম বিচার হচ্ছে, এই ধরনের ব্যবস্থা আছে, সেখানে এই স্যাংশন কী কারণে?’
২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনে পর দেশের স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদের সব নির্বাচন ‘সুষ্ঠুভাবে’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
‘এবং মানুষ তাদের ভোট দিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবতাটা কী? বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার নিয়ে সব সময় সচেতন। কেউ ভোট চুরি করলে তাদেরকে ক্ষমতায় থাকতে দেয় না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়া ভোট চুরি করেছিল। সে কিন্তু দেড় মাসও টিকতে পারে নি। জনগণের রুদ্ররোষে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
‘আবার ২০০৬ সালে। এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটার লিস্ট তৈরি করেছিল। সেই নির্বাচনের ঘোষণা দেয়ার পর জরুরি অবস্থা জারি হলো। সেই নির্বাচনও বাতিল হয়ে গেল।’
আন্দোলন করে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ কিন্তু ভোট সম্পর্কে এখনও যথেষ্ট সচেতন। একটা ইলেকশন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে- এটাতো আমাদেরই দাবি ছিল। আন্দোলন করে আমরাই সেটা প্রতিষ্ঠিত করেছি।
‘আজকে এখন তারা স্যাংশন দিচ্ছে। আরও স্যাংশন দেবে, দিতে পারে। এটা তাদের ইচ্ছা। কিন্তু আমার দেশের মানুষের যে অধিকার- তাদের ভোটের অধিকার, তাদের ভাতের অধিকার, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা সব মৌলিক অধিকার কিন্তু আমরা নিশ্চিত করেছি।’
২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বদলে গেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আর বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেই। এখন মানুষের হাহাকার নেই। এমনকি আমাদের বেকারত্ব, সেটাও কিন্তু কমিয়ে এখন মাত্র তিন শতাংশ।
‘মানুষ ইচ্ছে করলেই কাজ করে খেতে পারে। আজকে ডিজিটাল বাংলাদেশ। ওয়াইফাই কানেকশন সারা বাংলাদেশে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। রাস্তাঘাটের অভূতপূর্ব উন্নয়ন আমরা করে দিয়েছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এভাবে আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তো সেখানে এভাবে স্যাংশন দিয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেয়া! তো ঠিক আছে, আমেরিকা যদি স্যাংশন দেয়, আমেরিকায় আসতে পারবে না, আসবে না।
‘না আসলে কী আসে যাবে! আমাদের দেশে এখন যথেষ্ট কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। কাজেই আমরা দেখি, কী করে তারা,’ যোগ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।