বড় ভূমিকম্প হলে কী হবে, যা বললেন বিশেষজ্ঞরা

৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপেছে রাজধানীসহ সারাদেশ। এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বহু মানুষ বাড়ির বাইরে সড়কে কিংবা খোলা জায়গায় বের হয়ে আসেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যে কোনো সময় এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। ছোট ছোট ভূমিকম্প তারই লক্ষণ বা পূর্বাভাস দিচ্ছে। ভূমিকম্পে ক্ষতি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘরকে মজবুত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

শনিবার সকাল সাড়ে নটা ৩৫ মিনিটে ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সারাদেশ। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ কম্পনে নেড়ে ওঠে দালান-কোঠা। ভূমিকম্পটি উৎপত্তিস্থল লক্ষ্মীপুরে ২ নম্বর টেকটোনিক প্লেটে। উৎপত্তিস্থল ছিলো মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে। গেল চার মাসে প্রায় সাতটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হল বাংলাদেশ। 

যে কোনো স্থানে ভূমিকম্পের জন্য অন্যতম ভূমিকা রাখে ফল্ট লাইন। ভূত্বকের বড় খণ্ডকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। দুটি টেকটোনিক প্লেটের মাঝে থাকা ফাটলই হলো ফল্ট লাইন। অর্থাৎ যেসব স্থানে একটি প্লেট এসে আরেকটি প্লেটের কাছাকাছি মিশেছে বা ধাক্কা দিচ্ছে বা ফাটলের তৈরি হয়েছে, সেটিই ফল্ট লাইন। ফল্ট লাইন দ্বারা দুটি প্লেটের সংঘর্ষ হলে ভূমিকম্প হয়।

বাংলাদেশে তিনটি টেকটোনিক প্লেট রয়েছে যার মধ্যে দুই নম্বর প্লেটটি নোয়াখালি-সিলেট-সুনামগঞ্জ দিয়ে অবস্থান করছে। এই প্লেটটিতে গেল দেড়শ’ বছরে বড় ভূমিকম্প হয়নি। কাজেই এখানে যে শক্তি সঞ্চয় হয়েছে তাতে যে কোন সময় সাত মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, যা ঢাকার জন্য হবে ভয়াবহ। 

গেলো সাত মাসে দেশে কমপক্ষে ১০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এ বছর প্রথম ভূকম্পন অনুভূত হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের পাশাপাশি সেদিন কেঁপে ওঠে সিলেট। ৩ দশমিক ৯ মাত্রার এ ভূমিকম্পে বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ছোট ও মাঝারি ভূকম্পনে বড় শক্তি বের হওয়ার একটা প্রবণতার লক্ষণ দেখা গেছে। তার মানে, যে কোনো সময় একটি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে। তবে এই বড় ভূমিকম্প কবে হবে, সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

তিনি বলেন, এর আগেও ১৮৮৫, ১৮৯৭, ১৯৩০ সালে দেশে এমন সময়ে ৭টা বড় রকমের ভূমিকম্প হয়েছে। এরপর গত দেড়শ বছরে ভূমিকম্প কিন্তু সেরকম হয়নি। এখন আবার ভূমিকম্প হচ্ছে। সাধারণত প্রায় ১৫০ বছর পরপর বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

তিনি জানান, ১৮৬৯ সালে আমাদের দেশে ৭.৫ মাত্রার এবং ১৯১২ সালে ৭.৬ মাত্রার এবং ১৯১৮ সালে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। ৫.২ মাত্রার ছোট ছোট ভূমিকম্প পূর্বাভাস দেয় যে, আমাদের দেশে একটা বড় ভূমিকম্প হতে পারে। সেটা কবে হবে কেউ সঠিক বলতে পারে না। এটা প্রাকৃতিক। অদূর ভবিষ্যতে সেটা ৫-১৫ বছরের মধ্যেও হতে পারে; এবং আশঙ্কা হলো এর মাত্রা ৭ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, আমাদের এখন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যদি এমন হয় তাহলে কীভাবে ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো বাছাই করে সেসব ঠিক করতে হবে। ভবন নির্মাণের জন্য দেওয়া আইন মানতে হবে। মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে বিল্ডিং কোড এনফোর্সমেন্টকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে ৯৯ শতাংশ নতুন ভবন টিকে যায়। পুরোনো ভবনের জন্য মজবুতিকরণ পন্থায় যেতে হবে। কেউ নিয়ম অমান্য করে ভবন যেন বানাতে না-পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে এগুলো ভূমিকম্পে ভেঙে গেলে উদ্ধারকাজ করা যাবে না। উল্টো উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ করে সেসব এলাকাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ।

উল্লেখ্য, এর আগে গত দুই অক্টোবর সন্ধ্যায় সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এই ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্য। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২। গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে তিনটি কম্পন  অনুভূত হয়। এর মধ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে হওয়া ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ২ । এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৫৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে টাঙ্গাইলে। 

এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর সিলেট অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত। এছাড়া ৯ সেপ্টেম্বর আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসামে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে দুটি ভূমিকম্প হয়। ২৯ আগস্টের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট এবং ১৪ আগস্টের ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী সিলেটের কানাইঘাট এলাকা।