যুদ্ধদিনের বন্ধু সায়মন ড্রিং

লন্ডনভিত্তিক ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর রিপোর্টার সাইমন ড্রিং তখন কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে কাজ করছেন। লন্ডনের সদর দপ্তর থেকে ফোন করে তাকে বলা হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। সেখানে বড়ো কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তুমি ঢাকা যাও।’

এভাবেই ঢাকায় আসেন অকুতোভয় এবং মেধাবী ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। গুণী এ সাংবাদিক বিশ্বের সকল বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান বিবিসি, রয়টার্স, টেলিগ্রাফ, ওয়াশিংটন পোস্টে কাজ করেছেন। সাফল্যর স্বীকৃতি হিসেবে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।

সাইমন ড্রিং একমাত্র সাংবাদিক যিনি ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের ভয়াবহতা এবং নৃশংসতা কভার করতে পেরেছিলেন। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর জঘন্য ও নৃশংসতার বিবরণ তুলে ধরেন বিশ্ব দরবারে। তিনি বিশ্বকে জানান কীভাবে পাকিস্তানি সৈন্যরা এদেশের নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার, অবিচার করছে এবং নির্বিচারে গণহত্যায় লিপ্ত হয়েছে। 

১৯৭১ সালের ৬ মার্চ ঢাকা আসেন সাইমন ড্রিং। ঢাকায় আসার পরদিনই শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শোনার সুযোগ হয় তার। মঞ্চের খুব কাছে দাঁড়িয়ে পুরো ভাষণ শুনেছিলেন সাইমন।

এরপর ঢাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এর মধ্যে এসে যায় ২৫ মার্চ। তিনি জানতে পারেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কোনো সমঝোতা ছাড়াই ঢাকা ত্যাগ করছেন। এর মধ্যে বিদেশি সকল সাংবাদিকদের একসঙ্গে করে রাখা হয় ইন্টারকন্টিনেন্টালে।

কিছুক্ষণের মধ্যে হোটলের সকল সাংবাদিক জানতে পারেন ঢাকায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে পাকিস্তানের সৈন্যরা। রাতেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের মেজর সালেক সিদ্দিকী নিরাপত্তার অজুহাতে সকল বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন।

কিন্তু বাংলাদেশে থেকে যান সাইমন। হোটেলের বাঙালি কর্মচারীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে হোটেলেই লুকিয়ে ছিলেন সাইমন। ৩২ ঘণ্টা সময় কাটান হোটেলের লবি, ছাদ, বার এবং কিচেনে। বাঙালি হোটেল বয়ের সাহায্যে হোটেল ছেড়ে বের হয়ে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (আগে নাম ছিল ইকবাল হক) যান তিনি। সেখানে গিয়ে তিনি বিভীষিকাময় অধ্যায়ের মুখোমুখি হন। ছাত্রদের মৃতদেহ পুড়ছিল এখানে সেখানে, অনেক মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।

চারুকলা গিয়ে জানতে পারেন সেখানেও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। আশপাশের এলাকাগুলো ঘুরে চিত্র এবং তথ্য জোগাড় করতে থাকেন সাইমন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে গিয়ে দেখেন পাকিস্তানি সেনারা পতাকা উড়িয়ে রেখেছে এবং শত শত মৃতদেহ ট্রাকে তুলে নিচ্ছে।

আরও পড়ুন: বিদায় হে বন্ধু!

একদিন পর ব্রিটিশ হাই কমিশনের সহায়তায় ঢাকা ছাড়েন সাইমন। কিন্তু তাকে এয়ারপোর্টে নাজেহাল করা হয়। উলঙ্গ করে চেক করা হয় সাথে কী নিয়ে যাচ্ছেন! তার ক্যামেরা নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। পায়ের মোজায় কাগজ লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ধরা পড়ে যান। এরপর তার পায়ুপথে লাঠি ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে তাকে পাকিস্তানের করাচিতে পাঠানোর চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তান গেলে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবেন না। তাই ব্যাংকক চলে যাওয়া স্থির করেন। ব্যাংকক থেকে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রতিবেদন পাঠান ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে। 

৩০ মার্চ তা প্রকাশিত হয়। এটাই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বহির্বিশ্বে প্রচারিত প্রথম সংবাদ। এই খবরটি ছাপা হবার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিদেশীদের টনক নড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত সৃষ্টিতে এ প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছিল।

প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘আল্লাহর নামে আর অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও সন্ত্রস্ত এক নগর। পাকিস্তানি সৈন্যদের ঠাণ্ডা মাথায় টানা ২৪ ঘণ্টা গোলাবর্ষণের পর এ নগরে অবশিষ্ট আর কিছু নেই।’

তার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের একটি চিত্র সবার সামনে উঠে আসে এবং এরপরই পাকিস্তানকে চাপ দিতে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহল। 

আমাদের সেই পরম বন্ধু সাইমন আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

একাত্তর/এসি