বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটি। গণতন্ত্রের অবনতি ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কারণ দেখিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তার তৎপরতার কারণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের ওপর থেকে জনগণ আস্থা হারিয়েছে। আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও দাবি করা হয়েছে, ব্যক্তি স্বার্থের বিনিময়ে সরকারি নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি।
বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর ঠিকাদারি অবৈধভাবে পাইয়ে দেয়ার জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন জেনারেল আজিজ। তাছাড়া, তার ভাইয়ের অপরাধ সত্ত্বেও তাকে বাঁচাতে দুর্নীতির আশ্রয় নেন বলে দাবি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডোনাল্ড লু’র সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সপ্তাহ না ঘুরতেই এমন সিদ্ধান্ত জানালো যুক্তরাষ্ট্র। এর আগেই বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র্যাবের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন প্রসাশন। এছাড়া গত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে বহুল আলোচিত ভিসানীতি নিয়েও চাপে আছে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান প্রশাসন।
মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘ভিসা নীতি কারও ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেটি অন্য একটি আইনের অধীনে নেওয়া হয়েছে।’ জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সেটি অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন আইনের অধীনে বলে তিনি জানান।
একইভাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানকে ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস অ্যাক্টের ৭০৩১ (সি) ধারার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন শক্তিশালী করতে নিজেদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। যার ধারাবাহিকতায় আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা।
মার্কিন আইনটি সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে:
ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেট, ফরেন অপারেশনস এবং রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন অ্যাক্ট, ৭০৩১ (সি) সেক্রেটারি অফ স্টেটকে এই ক্ষমতা প্রদান করে যে, বিদেশি সরকারের কর্মকর্তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য অযোগ্য হবেন, যখন সেক্রেটারি অফ স্টেটের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে যে, বিদেশি কর্মকর্তা উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি অথবা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। যদিও এখানে প্রত্যক্ষ জড়িত বলতে কি বোঝায় সে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তবে অতীত কার্যকলাপ থেকে যতটুকু বোঝা যায় তা হচ্ছে, অপরাধের সাথে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অথবা অপরাধের হুকুমদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে। তবে এই আইনে সম্পদ ফ্রিজ করে দেয়া বা কোনো অর্থনৈতিক দণ্ডের কথা বলা হয়নি। ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটকে তার যাবতীয় কার্যক্রমের জন্য কংগ্রেসকে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়।
প্রাথমিকভাবে, ২০০৮ সালে এই আইনটি প্রাকৃতিক সম্পদের দুর্নীতির সাথে জড়িত অফিশিয়ালদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিধান রেখে প্রণীত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১২, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কয়েকধাপে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে আইনটি পাবলিক অথবা প্রাইভেট যেকোনো ধরনের দুর্নীতি অথবা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্য অথবা প্রতিষ্ঠানের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করে।
পাঁচ বছর বা ততোধিক সময়ের মধ্যে বেশি সময়ের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন বা দুর্নীতির জন্য, ধারা ৭০৩১ (সি) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞা ৩৯ বছর পুরানো কর্মকাণ্ডের জন্যও আরোপ করা যায়।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই প্রোগ্রামের জন্য সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুপারিশগুলোকে স্বাগত জানায়, যা গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কির মতো ট্রেজারি-নেতৃত্বাধীন প্রোগ্রামগুলির অধীনে বিবেচনার জন্য নিষেধাজ্ঞার সুপারিশগুলোর সাথে একযোগে জমা দেয়া যেতে পারে। একটি এনজিও বা অন্য পক্ষ একটি অভিযুক্ত অপরাধীর সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য জমা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ভ্রমণের আগে একটি বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা ট্রিগার করতে সক্ষম হতে পারে।
আইনটি এখন পর্যন্ত যাদের উপর কার্যকর হয়েছে:
মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য নিষেধাজ্ঞা পাওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে রয়েছে, ২০০৯ সালে ভেনেজুয়েলায় মাদুরো শাসনের প্রতি সমর্থন এবং সেখানে অত্যাচার এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকরসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কিউবান কমিউনিস্ট পার্টির ফার্স্ট সেক্রেটারি রাউল কাস্ত্রো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিও সিজার গ্যান্ডারিলা, কিউবার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর মন্ত্রী লিওপোল্ডো সিনট্রা ফ্রিয়াসের উপর নিষেধাজ্ঞা।
২০২২ সালে তিব্বতীয় জননিরাপত্তা ব্যুরোর পরিচালক ঝ্যাং হংবো’কে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনে জড়িত থাকার জন্য। তিনি তিব্বতীদের নির্বিচারে আটকের সাথে জড়িত ছিলেন।
২০২০ সালে তৎকালীন শ্রীলঙ্কান আর্মি কমান্ডার সাভেন্দ্রা সিলভাকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিলো, ২০০৯ সালে বিচার বহির্ভূত হত্যার সাথে জড়িত থাকার জন্য।
দুর্নীতির কারণে নিষেধাজ্ঞা পাওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ২০২৩ সালে পানামার প্রেসিডেন্ট রিকার্ডো আলবার্টো মার্টিনেল্লি, ২০২০ সালে মলডোভান কর্মকর্তা এবং অলিগার্চ ভ্লাদিমির প্লাহোতনিক, ২০২৩ সালে সার্বিয়ান জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধি ভেরিকা রাদেতা এবং পেটার জোজিচ এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইউক্রেনের সিনিয়র জাজ পাভলো ভভোক।
২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত পৃথিবীর মোট ৬০টি দেশের ৪৯৬ ব্যক্তি বিশেষ-এর উপর এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে দুর্নীতির সাথে জড়িত ৩১২ জন, মানবাধিকারের সাথে জড়িত ১৭৭ জন এবং ৭ জন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতি উভয়ের সাথেই জড়িত ছিলেন।