ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় জেলাগুলোতে চলছে প্রস্তুতি। সভা করে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ঝড় মোকাবিলায় কাজ করবে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন।
রোববার সন্ধ্যায় প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল খুলনা থেকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মাঝামাঝি স্থানে আঘাত হানতে পারে। এরই প্রভাবে কিছুটা উত্তাল হয়ে উঠেছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত।
এছাড়া সাগর ও নদীতে জোয়ারে পানির উচ্চতা ২-৩ ফুট বেড়েছে। পানির স্রোতে মিঠাগঞ্জ, নীলগঞ্জ, ডালবুগঞ্জ, ধানখালী, চম্পাপুর ও লালুয়া ইউনিয়নের কয়েক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙ্গতে শুরু করেছে। ঝড় এলে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা করছে এখানকার বাসিন্দারা।
তিন দিকে নদী ও এক দিকে সাগরঘেরা উপজেলা রাঙ্গাবালী। জনপদের মানুষের কাছে দুর্যোগের খবর মানেই আতঙ্ক। এখানেও নদ-নদীতে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে এক থেকে দেড় ফুট বেড়েছে।
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক বলেন, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা পটুয়াখালী জেলায় ৭০৩টি সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাদের ধারণ ক্ষমতা তিন লাখ ৫১ হাজার ৫০০ জন মানুষ এবং ৮৭ হাজার ৮৭৫টি গবাদি পশু রাখার সুযোগ রয়েছে।
সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবেলায় ১৬৯টি আশ্রয় কেন্দ্রসহ ৮৮৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছেন ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক।
খুলনায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৬০৪টি সাইক্লোন শেল্টার ও ৩টি মুজিব কিল্লা।
২০০৯ সালের ২৫ মে সুন্দরবনে আছড়ে পড়েছিল ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় আইলা। ভয়ংকর সেই দুঃস্বপ্ন ফের ফিরে আসতে পারে এই শঙ্কায় মোংলার মানুষ। তবে প্রশাসন বলছে তারা যে কোন ধরনের পস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় রেমাল মোকাবেলায় বরগুনায় সচেতনতামূলক মাইকিং করেছে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা।
মোংলাতেও কোস্টগার্ড মাইকিং করেছে। মোংলার কোস্টগার্ড কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মোঃ মুনতাসীর ইবনে মহসীন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণ, মৎস্যজীবী ও নৌযান সমূহকে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন উপকূলীয় অঞ্চলে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুন্দরবন উপকূলের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের স্টেশন এবং আউটপোস্ট সমূহ মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করছে। ঘূর্ণিঝড়ের বিপদজনক পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষার জন্য নিকটবর্তী সাইক্লোন সেল্টার স্টেশনে আশ্রয় গ্রহণের প্রস্তুতির জন্য সকলকে সচেতন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ঘূর্ণিঝড় রেমালকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বরিশালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে। জেলার ৫৪১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রেমালের গতিপ্রকৃতি ও ধরন পর্যবেক্ষণ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কতৃপক্ষ। উপকূলীয় মানুষকে সচেতন করতে কাজ করছে কোস্টগার্ড।
শনিবার দুপুরে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি বাস্তবায়ন বোর্ডের জরুরি সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান সাংবাদিকদের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস পর্যালোচনা করে আমরা ঝড়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাত ৮টায় আবার এই মন্ত্রণালয়ে সভা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল ১১টায় আমরা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছি। এক কথায় এ ঘূর্ণিঝড় আসন্ন, সেটা মাথায় রেখে আমরা প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আমাদের কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছি।
কয়টি জেলা আক্রান্ত হতে পারে-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে সাতক্ষীরা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো এলাকাটি অ্যাফেক্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। এখন ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থান করছে। বিশেষ করে পায়রা ও মোংলা পোর্টের সরাসরি দক্ষিণে।
সিডরের মতো কি কোনো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে? জানতে চাইলে দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা বিপজ্জনক হতে পারে রাত ১২টা-১টা নাগাদ। এটা ১০ নম্বর মহাবিপদে চলে যেতে পারে, এরকম একটা সম্ভাবনা আছে।
তিনি বলেন, কালকে ভোর থেকে এটা প্রাথমিক আঘাত হানার সম্ভাবনা শুরু হবে। কালকে সন্ধ্যা নাগাদ মূলটা আঘাত হানবে। পূর্বাভাসে আমরা এরকমই বুঝতে পারছি এবং আজকে রাত ১২টা-১টা থেকেই এটা ডেঞ্জার পয়েন্টে চলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, উপকূলীয় জেলায় আমাদের প্রায় চার হাজার আশ্রয়কেন্দ্র আছে। এগুলো আমরা প্রস্তুত রেখেছি। খাদ্যের জন্য আমাদের প্রত্যেকটি জেলায় গুদামে পর্যাপ্ত শুকনো খাবারসহ যেসব জিস দরকার হবে এগুলো মজুত রেখেছি। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে যাতে আরও সাপ্লাই দিতে পারি এজন্য আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রেখেছি। সার্বিক প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছি।
শনিবার রাত ৯টা নাগাদ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রুপ নিতে পারে। রোববার সকালে এটি ‘প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ রূপ নিতে পারে।
আবহাওয়া অধিপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, গভীর নিম্নচাপটি উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মোংলা থেকে ৪৭৫ কিলোমিটার, পায়রা থেকে ৪২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে রয়েছে।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এখন কেন্দ্রর গতিবেগ ৫০-৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা। সমুদ্রবন্দরগুলো তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল খেপুপাড়া এবং ভারতের সাগর আইল্যান্ডের মাঝ দিয়ে যাবে। রোববার সকাল থেকে ঝূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাব পড়বে। তবে মূল ঝড়টি সন্ধ্যা নাগাদ স্থলভাগ অতিক্রম করবে। যখন উপকূলে আসবে তখন দুই থেকে চার মিটার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে সিগন্যাল বাড়বে।
সাগরে কোনো ঘূর্ণিবায়ুর চক্রে কেন্দ্রের কাছে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ৬২ কিলোমিটারের বেশি হলে তখন তাকে ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার হলে তাকে ‘ঘূর্ণিঝড়’ বলা হয়। বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৮৯-১১৭ কিলোমিটার হলে তাকে ‘প্রবল ঘূর্ণিঝড়’ বলা হয়। বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১১৮-২১৯ কিলোমিটার হলে তাকে ‘হারিকেনের গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড়’ বলা হয়।