ছাগল চিহ্নিত করার আগে মতিউরদের ধরে ফেলুন: নাছিম

ছাগলকাণ্ডে আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা মতিউর রহমানের মতো আরও যারা আছেন তাদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে থাকা ‘মতিউরদের’ ছাগল বা বোবা প্রাণী দিয়ে চিহ্নিত করার আগে চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতি তার এই আহ্বান।

বুধবার সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ‘দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের’ পক্ষে বিবৃতি দেওয়ায় সংগঠগুলোরও সমালোচনা করেন।

বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, যারা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকেন যেমন মতিউরকে- দুর্নীতি দমন কমিশন, গণমাধ্যম এমনকি আমরা যারা রাজনীতিবিদ আছি তারা চিহ্নিত করতে পারি নাই। তাকে একটি বোবা প্রাণী ছাগল চিহ্নিত করেছে। এমন মতিউর আরও আছে কি না, ভবিষ্যতে ছাগল বা অন্য কোনো বোবা প্রাণী চিহ্নিত করার আগে তাদের চিহ্নিত করার প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সংস্থার।

১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কেনা নিয়ে হঠাৎ আলোচনায় আসার পর মতিউর রহমানের ভূরি ভূরি সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে।

তিনি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট। রোববার সেখান থেকে তাকে সরিয়ে সংযুক্ত করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে।

এনবিআরে থাকার সময় সরকারি চাকরির প্রভাব খাটিয়ে মতিউর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ।

চাকরির আড়ালে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, বিঘার পর বিঘা জমি, রিসোর্ট, কোম্পানির মালিকানাসহ অজস্র সম্পদ গড়ে তোলেন এই সরকারি চাকুরে।

মতিউরের নেতৃত্বে একটি চক্র দেশের পুঁজিবাজারে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে খবর বেরিয়েছে। প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে বিনিয়োগের শত শত কোটি টাকা মতিউর চক্র হাতিয়ে নিয়েছে বলেও খবর বেরোচ্ছে।

সম্পদের পাশাপাশি জনসম্মুখে আসছে মতিউরের পারিবারিক কেচ্ছাও। তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান। এর আগে ছিলেন শিক্ষক।

ওই শিক্ষকের তার নির্বাচনী হলফনামায় পাহাড়সম সম্পদের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা দেখে চোখ ছানাবড়া হওয়ার দশা। এই কানিজও শেয়ারবাজারের বিশাল সুবিধাভোগী।

এতোদিন দোর্দণ্ড প্রতাপে মতিউরের ভয়ে কেঁপেছেন অনেকেই। এনবিআরের চেয়ারম্যান পর্যন্ত তাকে সমঝে চলতেন। দাপুটে এই লোক যোগাযোগ রাখতেন প্রভাবশালীদের সঙ্গে। গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব প্রভাব বলয়। সেই বলয়ের সদস্যদের নামও এখন আকার ইঙ্গিতে বেরিয়ে আসছে।

সংসদে নাছিম বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, সেক্ষেত্রে তারা যেন এ বোবা ছাগলের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলা, বিবৃতি দেওয়া, পক্ষ নিয়ে প্রকারান্তরে দুর্নীতিবাজ কোনো ব্যক্তিকে রক্ষার নামে তাদের সংস্থার সকলের উপর দায়ভার না চাপায় সেদিকে সকলের সজাগ থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, কোনো রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতি বা অপকর্মের অভিযোগ আসে তখন রাজনীতিবিদরা পদক্ষেপ নেয় বা পক্ষ নেয় না। বরং রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও আইনি বিচারে সোচ্চার হয়। এটাই হল সৎ রাজনীতিবিদদের মহত্ত্ব। কিন্তু কখনও আমরা দেখতে পাই কোনো সরকারি বা বেসরকারি, আধা-সরকারি কিংবা সংস্থা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষ কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ যখন আসে, তখন ওই গোষ্ঠী বা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দুর্নীতিবাজের পক্ষে সাফাই বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান করে। প্রকারান্তরে বিশেষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের দায় কিন্তু ওই সংস্থাগুলো গ্রহণ করে। পুরো সংস্থার উপর চলে আসে এ দায়। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

সম্প্রতি পুলিশের সাবেক একাধিক কর্মকর্তার দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয় পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।

বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো দলের বা সংস্থার হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিকে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে।

ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতে ঋণ খেলাপি কমাতে হবে বলে উল্লেখ করেন বলেন, ঋণ খেলাপি, অর্থপাচারকারী, ব্যাংক লুটেরা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সিন্ডিকেট যারা করে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের তালিকা প্রণয়ন করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

নাছিম বলেন, বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে এই দুষ্টচক্র, সর্বগ্রাসী, স্বার্থান্বেষী চক্রের হাত থেকে দেশের জনগণকে রক্ষা করতে হবে।

বাজেট আলোচনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ছোটরা ধরা পড়লেও রাঘব-বোয়ালরা ধরা পড়ে না। এখন সামনে এসেছে পুলিশের বড় কর্মকর্তা, এনবিআরের বড় কর্মকর্তা- তারা দুর্নীতি করেন। কথায় আছে চোরের ১০ দিন মালিকের একদিন।