এবার দৃশ্যপটে আবেদ আলী, কুলি থেকে কোটিপতি

করোনাভাইরাস মহামারিরে মধ্যে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসেন প্রতারণাসহ নানা কাণ্ডে জড়িত সৈয়দ মোহাম্মদ সাহেদ। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। তখন টেলিভিশন টক-শোতে নীতি পরামর্শ দেওয়া সাহেদের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

সেই ঘটনার চার বছর পর এসে যেনো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে পিএসপির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে নিয়ে। প্রশ্নফাঁসের মতো অবৈধ কাজে জড়িয়ে কুলি থেকে কোটিপতি হওয়া আবেদের ফেইসবুকে নীতিবাক্যের অভাব নেই।  

নিজের ওয়ালে তিনি লিখেছেন, আমি একজন অতি সাধারণ খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষ। আমার জীবনে কোনোদিন অসদুপায় অবলম্বন করিনি। গায়ে খেটে ভাগ্য পরিবর্তন করেছি।

abed ali3

নিজেকে খোলসবন্দী করে রাখতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন আবেদ আলী। ধর্মপরায়ণতা, এলাকার অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করার মতো কাজগুলো করতেন তিনি। তাই তার খোলসহীন কুৎসিত রূপ আবডালে থেকেছে বেশ কিছুদিন।   

কিন্তু আবেদের উত্থান কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। সবকিছুই তিনি করেছে প্রায় প্রকাশ্যে। বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, খামার, কোম্পানির মালিকানাসহ পাহাড়সম সম্পদ তিনি গড়ে তুলেছেন। সেসব ভোগ করেছেন জনসম্মুখে। নিজে গাড়িচালক হলেও আবেদ আলীর রয়েছে একাধিক ড্রাইভার। ছেলের জীবনযাপনও রাজকীয় স্টাইলের।

নিজেও রাজনীতিতে জড়ানোর উচ্চাকাঙ্খায় ছিলেন এই গাড়িচালক। নেমেছিলেন গণসংযোগে। তার মাদারীপুরের ডাসারে গ্রামের বাড়িটি যেন প্রাসাদ। সেখানে মাঝেমধ্যে গাড়িবহর নিয়ে যেতেন আবেদ। দান খয়রাত করে সেসব ছবি দিতেন ফেইসবুকে।

abed ali1

কিন্তু কালের ফেরে পড়ে সেই আবেদ এখন কারাবন্দি। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) পরীক্ষাসহ ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে সোমবার সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন আবেদ আলী, তার ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম এবং পিএসসির ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তাসহ ১৭ জন।

বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নফাঁস করে সর্বনাশ ঘটিয়েছেন যোগ্য সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের। আর অযোগ্যরা চাকরি পেয়েছেন তার জোচ্চুরিতে। সর্বশেষ রেলের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসেও এই আবেদ চক্রই জড়িত বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের।

যেভাবে উত্থান

মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামের মৃত সৈয়দ আ. রহমানের ছেলে সৈয়দ আবেদ আলী ওরফে জীবন। তারা তিন ভাই ও এক বোন। ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান। তখন তার মা অনেক কষ্ট করে সংসার চালান। মানুষের জমিতে ধান কুড়িয়ে তা বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগাড় করতেন তার মা।

এমনকি কোরবানির ঈদের সময় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস কুড়িয়ে তা বিক্রি করে, সেই টাকায় খাবার কিনতে হতো। এরপর রাতে কখনো কখনো ফুটপাতেও ঘুমিয়েছেন। এভাবেই তার ছোটবেলা কেটেছে।

abed ali6

সৈয়দ আবেদ আলী ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ঢাকায় চলে আসেন। প্রথমে কুলির কাজ দিয়ে শুরু হয় তার কর্মজীবন। রিকশা চালানো, হোটেলে কাজ, চাল বিক্রি করাসহ যখন যে কাজ পেয়েছেন, এক সময় তাই করেছেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরি পেয়ে যান পিএসসিতে। এরপরই তার ভাগ্যের চাকায় পরশ লাগে আলাদীনের চেরাগের।

আবেদের বড় ভাই জবেদ আলী একজন কৃষক। বাড়িতে কৃষিকাজ করেন। এক বছর হলো তার এক ছেলেকে ইতালি পাঠিয়েছেন। মেজো হচ্ছেন আবেদ আলী। ছোট সাবেদ আলী, তিনিও দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। সম্প্রতি দেশে এসে ধারদেনা করে ছেলেকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠান। কিন্তু পাঁচ মাস হলেও এখনো ইতালি যেতে পারেননি, লিবিয়াতেই আছেন।

কত সম্পদ

বর্তমানে তার অঢেল সম্পদের খোঁজ চলছে। তবে গোয়েন্দারা এরই মধ্যে তার স্থাবর অস্থাবর বহু সম্পদের খোঁজ পেয়েছেন। নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স। কুয়াকাটায় আছে থ্রি স্টার মানের সান মেরিন হোটেল। বরিশাল জেলার গৌরনদীতে জমি, আছে একটি পাকা মসজিদ।  ঈদের নামাজ পড়ার জন্য ঈদগাহ ও বাগান কিনেছেন তিনি। নিজ এলাকাতেই আছে শতবিঘার মতো ফসলি জমি।

abed ali8

এখানেই শেষ হচ্ছে না আবেদের সম্পদের ফিরিস্তি। প্রশ্নফাঁসে বিপুল পরিমাণ টাকা বাগিয়ে হয়ে গেছেন গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক। রয়েছে ডেইরি ফার্ম ও বাগানবাড়ি। রাস্তার পাশে সরকারি জায়গা দখল করে তৈরি করেছেন মার্কেট। ঢাকার মিরপুর ও উত্তরায় রয়েছে দুটি বহুতল বাড়ি। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তার অন্তত সাতটি ফ্ল্যাট এবং তিনটি প্লট রয়েছে বলেও গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। 

বিলাসী জীবন

পিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক ড্রাইভার সৈয়দ আবেদ আলী পৈতৃক ভিটা থেকে বেশ দূরে জমি কিনে তিনতলার ভবন বানিয়েছেন। বর্তমানে বাড়িটির রঙের কাজ চলছে। বাড়ির সামনে গড়ে তুলেছেন সৈয়দ আবেদ আলী কেন্দ্রীয় মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ। পাশেই আছে আমসহ বিভিন্ন গাছের ছোট্ট একটি বাগান। তা ছাড়া নিজ নামে, স্ত্রী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়িসহ বিভিন্ন নামে তিনি বহু জমি কিনেছেন।

বড় ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামকে পড়িয়েছেন ভারতে শিলিগুড়ির একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। সিয়াম বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং মাদারীপুরের ডাসার উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি। সায়েমকে গ্রেপ্তারের পর তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

পরিবার নিয়ে আবেদ আলী থাকতেন শেওড়াপাড়ার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে। ওই ভবনের তিন ফ্ল্যাটের মালিক। রয়েছে কয়েকটি গাড়ি। নিজে গাড়িচালক হলেও সার্বক্ষণিক একাধিক ড্রাইভার রয়েছে তার।

abed ali7

মাসে দুই একবার গ্রামের বাড়িতে যেতেন আবেদ ওরফে জীবন। দীর্ঘদিন ধরেই ডাসার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিলাসী জীবনযাপনে ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম যেন বাবার থেকেও আরেক কাঠি সরেশ। গত কোরবানির ঈদে তিনি এক কেজি করে ১০০ জনকে মাংস দিয়েছেন। আর সিয়াম সেই মাংস বণ্টন করেছেন বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে। এরকম বিলাসবহুল গাড়ি সিয়ামের একটি না, আরও কয়েকটি রয়েছে।

সৈয়দ আবেদ আলী জীবন বাড়িতে এসে গ্রামের বিভিন্ন গরিব মানুষকে নানা ধরনের সহযোগিতা করতেন। তাই গ্রামের মানুষ তাকে বেশ পছন্দ করেন। তারা অবশ্য  আবেদ আলীর কুকর্মের তেমন কিছুই জানতেন না।

কিছুদিন আগে আবেদ আলী ওরফে জীবন রাস্তার পাশে সরকারি জায়গা দখল করে গরুর খামার ও মার্কেট নির্মাণের চেষ্টা করেন। পরে সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

abed ali4

যা বলছেন এলাকাবাসী

এদিকে সৈয়দ আবেদ আলীর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তালাবন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় রহিম বলেন, আবেদ আমার কাছ থেকে ২৬ শতাংশ জমি কিনেছেন। প্রায় এক বছর আগে আমি তার কাছে এই জমি বিক্রি করেছি।

প্রতিবেশী আবুল কালাম বলেন, আবেদ আলী অনেক কষ্ট করেছেন। তিনি কুলির কাজ, হোটেলে কাজ, রিকশা চালানো, চাল বিক্রিসহ নানা কাজ করেছেন। ফুটপাতেও থেকেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অভাবের কারণে পড়াশোনা বাদ দিয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চলে যান। কুলির কাজ দিয়ে শুরু হয় তার কর্মজীবন। বহু রাত একা একা রেলস্টেশনে ঘুমিয়েছেন। এরপর হোটেলে খাবারের প্লেট ধোয়ার কাজ, রিকশা চালানো, চাল বিক্রিসহ যখন যে কাজ পেয়েছেন, তা-ই করেছেন।

abed ali9

এলাকার মানুষের ধারণা, আবেদ আলী অনেক পরিশ্রম করে ধাপে ধাপে ধনী হয়েছেন। ব্যবসা করেই তিনি বড়লোক হয়েছেন। ডাসার বালীগ্রাম ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বর সেলিম ফকির বলেন, সৈয়দ আবেদ আলী অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি অনেক কষ্ট করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এলাকার মানুষদের অনেক সহযোগিতা করেন। তার এই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আমরা কিছুতেই মানতে পারছি না।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশীদ বলেন, পিএসসির সাবেক ড্রাইভার সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের সম্পত্তির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।