রাষ্ট্র সংস্কারে পাঁচ কমিশনের কাজ শুরু

জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ শুরু করলো পাঁচটি সংস্কার কমিশন। পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফররাজ হোসেন জানান, একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে দেড়শো বছরের পুরোনো আইন সংস্কারের সুপারিশ দেবেন তিনি। আর, সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন মুরশীদ জানান, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। প্রশাসনে কোনো চাপ নেই বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠন করে সরকার। পাঁচটি সংস্কার কমিশনের কাজ শুরুর লক্ষ্যে গেলো বৃহস্পতিবার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রোববার থেকেই শুরু হলো সংস্কার কমিশনগুলোর কাজ। 

সংসদ ভবনে বসবে আইন-বিচার, নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের কার্যালয়। রোববার সেখানে তিন কমিশনের কক্ষগুলো গোছানোর কাজ চলতে দেখা গেছে। দু’একদিনের মধ্যেই সেখানে সংশ্লিষ্ট কমিশনের প্রধানগণ তাদের কাজ শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।  

সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করেন পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন। তিনি বলেন, পুলিশকে সত্যিকারের জনবান্ধব একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোই মূল লক্ষ্য। বেঁধে দেয়া সময় তিন মাসের মধ্যেই সবার মতামতের ভিত্তিতে কমিশন তার প্রতিবেদন দেবে।

কমিশন প্রধান ও সদস্যদের পদমর্যাদা হবে সরকার নির্ধারিত। সেই অনুযায়ী তারা বেতন-সম্মানি এবং সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তবে কমিশন প্রধান বা কোনো সদস্য অবৈতনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাইলে বা সুযোগ-সুবিধা নিতে না চাইলে প্রধান উপদেষ্টা অনুমোদন করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থা কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবে এবং সব ধরনের সহযোগিতা করবে। কমিশন প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যক্তিকে কমিশনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।

পুলিশ সংস্কার কমিশন

সাবেক সচিব সফর রাজ হোসেনকে পুলিশ সংস্কার কমিশন প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইকবাল, সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক শেখ সাজ্জাদ আলী, ডিআইজি গোলাম রসুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা, মানবাধিকারকর্মী এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে এই কমিশনে সদস্য হিসেবে আছেন স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহেমদ, নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ডা. জাহেদ উর রহমান, শাসন প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন, ইলেকট্রনিক ভোটিং ও ব্লকচেইন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সাদেক ফেরদৌস। এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকবেন এই কমিশনে, যার নাম ঘোষণা করা হয়নি।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান এই কমিশনের প্রধান। সদস্য হিসেবে আছেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমদাদুল হক, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফরিদ আহমেদ শিবলী, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ সাইয়েদ আমিনুল ইসলাম, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মাজদার হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তানিম হোসেন শাওন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক (সুপন) ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।

দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন

ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে

র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানকে এই কমিশন প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সদস্য হিসেবে আছেন সাবেক কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল মাসুদ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোস্তাক খান, ব্যারিস্টার মাহদীন চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা শারমিন ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে কমিশন প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে সদস্য হিসেবে আছেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ তারেক, সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব রিজওয়ান খায়ের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এ ফিরোজ আহমেদ ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।

 

এদিকে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দু’মাসের কাজের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ জানান, জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে মোট ১০৫ জন শিশু মারা গেছে। নিহত প্রত্যেক শিশুর পরিবারের হাতে ৫০ হাজার টাকা এবং মানপত্র দেব।

তিনি আরও জানান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে দেওয়া ভাতার ৪১ শতাংশ সঠিক ব্যক্তি পাচ্ছেন না বলে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের গবেষণায় উঠে এসেছে। এক কোটি ২০ লাখ মানুষ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা পেয়ে থাকেন।

শারমীন এস মুরশিদ বলেন, ইউনিসেফ আমাদের কাছে স্টাডি পাঠিয়েছে ৪১ শতাংশ ভাতা সঠিক ব্যক্তির কাছে যাচ্ছে না। এটা তো বিশাল সংখ্যা, এটাতো ফেলে রাখতে পারি না। একটা হচ্ছে যারা পাওয়ার কথা পাচ্ছে না, আর একটা হচ্ছে ভুল জায়গায় যাচ্ছ- এ দুটোরই পরিসংখ্যান আমরা পেয়েছি। এগুলো আমরা যাচাই করছি। রিভিউতে থাকা এমআইএস অ্যাপ্লিকেশনটি যখন হয়ে যাবে তখন এ জায়গাটা থেকে অনেক উন্নতি হবে।