আউটলুকের প্রতিবেদন

যুক্তরাজ্যে বসুন্ধরা পরিবারের হাজার কোটি টাকার ২৬ সম্পত্তি

দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী- বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী আউটলুকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা (৬০ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং) মূল্যের ২৬টি সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। আউটলুকের ইংরেজি ও বাংলা উভয় সংস্করণেই বসুন্ধরা গ্রুপের অর্থপাচার বিষয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। 

গত ৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের কারণে শেখ হাসিনার পতনের পর, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বসুন্ধরার জমি দখল এবং খাল, জলাভূমি এবং কবরস্থানসহ সরকারি সম্পত্তি বেআইনিভাবে ভরাটের অভিযোগের সম্মিলিত তদন্ত শুরু করে।

সিআইডির একাধিক সূত্র আউটলুককে জানিয়েছে, এই সংস্থার তদন্তের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনভীরের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও অর্থ পাচারের কোনো প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। 

ওয়েলিংটন এভিনিউতে অ্যাপার্টমেন্ট সৌজন্য: আউটলুক

তবে আউটলুক বলেছে, তাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যে বসুন্ধরার প্রায় এক হাজার কোটি টাকা (৬০ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং) মূল্যের ২৬টি সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে এই ধরনের উল্লেখযোগ্য তহবিল স্থানান্তরিত হবার কোনো রেকর্ড নেই। 

শুধু তাই নয় বসুন্ধরা গ্রুপের বাংলাদেশের বাইরে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই। ফলে বিষয়টি অর্থ পাচারের বিষয়ে সিআইডির তদন্তকারীদের জন্য প্রশ্ন তৈরি করেছে। 

আউটলুকের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের সবচেয়ে বড় সম্পত্তি রয়েছে সেন্ট্রাল লন্ডনের ১৪ ওয়াইকম্ব স্কোয়ারে, যার মূল্য প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা (১০ মিলিয়ন পাউন্ড)। প্রায় ৫,০০০ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত এই সম্পত্তি ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর অস্টিনো নামে একটি কোম্পানির মাধ্যমে কেনা হয়।

ওয়াটারফ্রন্ট ড্রাইভে অ্যাপার্টমেন্ট সৌজন্য: আউটলুক

অস্টিনো লিমিটেড নামের এই কোম্পানিটির দুবাইতে একটি অফিস রয়েছে এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত শেল কোম্পানি। সম্পত্তিটির মালিক সাফওয়ান সোবহান, যিনি বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং আনভীরের ছোট ভাই। 

বসুন্ধরার কাছে থাকা দ্বিতীয় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি রয়েছে যুক্তরাজ্যের সারের ওয়েন্টউডের ভার্জিনিয়া ওয়াটার এলাকার ওয়েলিংটন এভিনিউতে। এই ফ্রিহোল্ড সম্পত্তিটি ২০২১ সালের ৯ আগস্ট প্রায় ১৩০ কোটি টাকায় (৮.৩৪ মিলিয়ন পাউন্ড) কেনা হয়েছিল।

এই সম্পত্তিটি গোল্ডেন ওক ভেঞ্চার লিমিটেডের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত আরেকটি শেল কোম্পানি, সিঙ্গাপুরের সানটেক টাওয়ারে একটি সংশ্লিষ্ট অফিস আছে। এর মালিক বসুন্ধরা গ্রুপের আরেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং আহমেদ আকবর সোবহানের ছেলে শাফিয়াত সোবহান।

ওয়াইকম্ব স্কোয়ারে অ্যাপার্টমেন্ট সৌজন্য: আউটলুক

আউটলুকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় সবচেয়ে ব্যয়বহুল হোল্ডিং হল সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি বিলাসবহুল ভবন। ওয়ান ওয়াটারফ্রন্ট ড্রাইভের ২৮ তলায় দুটি অ্যাপার্টমেন্ট। একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হয় প্রায় ১০৫ কোটি টাকা (৬.২৩ মিলিয়ন পাউন্ড) এবং অন্যটির দাম প্রায় ৯২ কোটি টাকা (৫.৬১ মিলিয়ন পাউন্ড)।

উভয় অ্যাপার্টমেন্ট ফক্সগ্লোভ এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড এবং রেড পাইন ট্রেডিং লিমিটেডের মাধ্যমে কেনা হয়েছিলো। এই দুই কোম্পানি সিঙ্গাপুরের সানটেক টাওয়ারে অফিসসহ ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত। উভয় প্রতিষ্ঠানের মালিক শাফিয়াত সোবহান।

এছাড়াও রয়েছে মার্বোর্ন হাউস, লন্ডনের ৫৬ এনিসমোর গার্ডেনে অবস্থিত আরেকটি ফ্রিহোল্ড সম্পত্তি। এই সম্পত্তিটি ৩১ অক্টোবর ২০০৫ সালে প্রায় ৭৮ কোটি টাকায় (৪.৯৫ মিলিয়ন পাউন্ড) কেনা হয়েছিল। এই সম্পত্তির নিবন্ধিত মালিক ছিলো আসিমিনা কনসাল্টিং ইনকর্পোরেটেড। 

মারবোর্ন হাউসে অ্যাপার্টমেন্ট সৌজন্য: আউটলুক

যথারীতি এই প্রতিষ্ঠানটিও একটি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস কোম্পানি, যাদের একটি অফিস সিঙ্গাপুরের সানটেক টাওয়ারে রয়েছে। যার বর্তমান মালিক আহমেদ আকবর সোবহানের বড় ছেলে সাদাত সোবহান তানভীরের স্ত্রী সোনিয়া ফেরদৌসী সোবহান।

আউটলুক তাদের অনুসন্ধানে দেখতে পেয়েছে, বিগত ১৫ বছরে বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন পরিবারের সদস্যরা ৮ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে ২১টি অতিরিক্ত আবাসিক সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেছে। তবে, এই সময়ের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপ বা পরিবারের কেউই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাইরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের জন্য অনুমতি নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে আউটলুক। 

সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিআইডি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, বসুন্ধরা গ্রুপ দেশের বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে, এ জন্য তারা তাদের জমির দাম বাড়িয়ে দেখিয়েছে, প্রতি কাঠার মূল্য ৩ কোটি টাকা হিসাবে উপস্থাপন করেছে। বিঘা প্রতি প্রকৃত দাম ২০-২৫ লাখ টাকা।

সিআইডি কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেছেন যে, এই তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দুবাই, সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস, লন্ডন, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য দেশে পাচার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আহমেদ আকবর সোবহানের বড় ছেলে সাদাত সোবহান সিঙ্গাপুরে বসুন্ধরা গ্রুপের অফিস পরিচালনা করেন।

লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি সৌজন্য: আউটলুক

বিদেশে সম্পত্তি ক্রয়ের রেকর্ড পর্যালোচনা করে আউটলুক পত্রিকা বলছে, বসুন্ধরা গ্রুপের সব সদস্য অন্যান্য দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। সাফওয়ান সোবহান এবং শাফিয়াত সোবহান সাইপ্রিয়ট হিসাবে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। অন্যদিকে সোনিয়া সোবহান সেন্ট কিটসের নাগরিকত্ব রয়েছে বলে দাবি করেছেন।

বিনিয়োগের মাধ্যমে সাইপ্রাসে নাগরিকত্ব পেতে হলে দেশটিতে ন্যূনতম দুই মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করতে হবে। যদিও আউটলুক সাফওয়ান, শাফিয়াত বা সোনিয়া বিদেশি নাগরিকত্ব এবং পাসপোর্টের জন্য কত ব্যয় করেছেন তা যাচাই করতে পারেনি, তবে জানা গেছে যে, সায়েম সোবহান আনভীর এবং পরিচালক ইয়াশা সোবহান পাসপোর্ট কেনার জন্য যথাক্রমে ৩ মিলিয়ন এবং ২ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছেন স্লোভাকিয়া এবং সাইপ্রাসে।

তদন্তে জানা গেছে যে, ওয়ার্ডেরা কর্পোরেশন নামে একটি স্লোভাকিয়ান কোম্পানির পরিচালক হিসাবে কাজ করছেন আনভীর, যেটি ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। সায়েম সোবহান আনভীর এবং সাবরিনা সোবহান কোম্পানির অংশীদার, যার মূলধন রয়েছে এক মিলিয়ন ইউরো।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, বিদেশি নাগরিকত্বে বিনিয়োগের জন্য কোনো লেনদেনের অনুমতি দেয় না বাংলাদেশ। ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করার কোনো বৈধ উপায় নেই, যার ফলে এই উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে, এই পরিস্থিতিকে মানি লন্ডারিং হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে।

আউটলুক পত্রিকা আরও জানিয়েছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যুক্তরাজ্য কার্যালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ নথি থেকে জানা গেছে যে, তারা বসুন্ধরার ইউকে রিয়েল এস্টেট এবং পোর্টফোলিওর তহবিলের উৎস অনুসন্ধান করছে। তারা যুক্তরাজ্যে বসুন্ধরা পরিবারের ২৬টি সম্পত্তি চিহ্নিত করেছেন, যার মূল্য প্রায় ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড, যার বেশিরভাগই শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবার সোবহান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরসহ তাদের পরিবারের ৮ জনের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ৬ অক্টোবর সব ব্যাংকে এই সংক্রান্ত চিঠিটি পাঠানো হয়। এছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের সব ধরনের ঋণ এবং আমদানি-রপ্তানির তথ্যও চাওয়া হয়েছে।