পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিক এবং সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে নির্মম ও বর্বরোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ অভিযোগ জমা দেন।
এ সময় হত্যার শিকার তৎকালীন বিডিয়ারের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে ব্যারিস্টার রাকিন আহমেদ, শহিদ কর্নেল মুজিবুল হকের স্ত্রী মেহরিন ফেরদৌসী, কর্নেল কুদরত এলাহীর ছেলে সাকিব রহমানসহ ১৫-২০ জন শহিদ পরিবারের সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওই সময় বিদ্রোহী জওয়ানদের হামলায় নিহত হন ৫৭ সেনা কর্মকর্তা।
অভিযোগ দাখিলের পর শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের আইনজীবী তাসমিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পিলখানার ঘটনার সময় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে যে বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গণহত্যার সামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে।
তৎকালীন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাঁর দোসররা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সংকটের মুখে ফেলতে এবং স্বৈরশাসনকে দীর্ঘায়িত করতে দুটি বড় আর শক্তিশালী বাহিনীকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এ গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।
তিনি আরও বলেন, সেনা কর্মকর্তাদের খুন করা হয়েছে। তাঁদের লাশে আগুন দেওয়া হয়েছে। বেয়নেট নিয়ে খুঁচিয়ে লাশ ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। যা গণহত্যা হিসেবেও পরিগণিত হবে।
ৱতাসমিরুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিক, সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, আইনমন্ত্রী এবং তখনকার বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান এবং যারা এ হত্যাকাণ্ড এড়াতে পারতেন; কিন্তু করেননি এমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অভিযোগ দিতে যাওয়া নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনেরা। কর্নেল মুজিবুল হকের স্ত্রী মেহরিন ফেরদৌসী বলেন, হত্যাকাণ্ডটিকে বিদ্রোহ বলবেন না। যারা পরিকল্পনা করে মেরে পোড়ানোর ব্যবস্থা করে, বেয়নেট দিয়ে খোঁচায়, ড্রেনে ফেলে, পরিবারদের-বাচ্চাদের বুট দিয়ে লাথি দিতে দিতে নিয়ে যায়। এমন অনেক কিছুই জানেন না, যেটা আমাদের সঙ্গে হয়েছে।
তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডকে বিডিআর বিদ্রোহ বলবেন না। বিদ্রোহ এ রকম হয় না। এটাকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডই বলতে হবে। তিনি এ ঘটনার পুনরায় তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান।
মেহরিন বলেন, এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলবেন? এর তদন্ত করলেই সত্যতা বের হয়ে আসবে এবং এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। আমরা আজও জানি না কিংবা আমাদের সন্তানরাও জানে না কী কারণে উনাদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের হত্যা করার জন্য কোনো একটি কারণ তো থাকতে হবে।
দেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব নষ্ট করার জন্যই এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘটনা দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করার একটি পরিকল্পনা ছিল। আমাদের দেশের তুখোড় কিছু অফিসারদের মেরে তারা শান্ত হয়নি বরং পরিবারের সদস্য ও আশপাশের অনেক সাহসীদেরও হত্যা করেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর দাবি জানান তিনি।
নিহত কর্নেল কুদরত এলাহীর সন্তান আইনজীবী সাকিব রহমান বলেন, আমি আইনজীবী হয়েছি, আইন পড়েছি একমাত্র বাবার হত্যার বিচার চাইতে। আমাদের বাবার হত্যার বিচার করে ছাড়বো। আমরা আশাবাদী- সঠিক বিচার পাব।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সময় তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, বাবা-মাকে (নাজনীন আহমেদ) কীভাবে মেরেছে, বলতে আমার বুকটা ফেটে যায়। আমাকে কর্মকর্তারা বলেছিলেন- বাবা, তুমি তোমার বাবা–মার লাশ দেখো না, নিতে পারবা না। আমি লাশ দেখতেই পারি নাই। এই নির্মমতা, বর্বরতা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না।
রাকিন আহমেদ আরও বলেন, একটাই অপরাধ ছিল তাদের, তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসতো। বাইরের শত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করত। বিশ্বাস আছে, বিজয় হবেই।
শহিদ মেজর তামজিদ হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা বলেন, হত্যাকাণ্ডে আমার স্বামীর লাশ পাওয়া যায়নি। চারবার ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছে। ১০ মাস পর একজনের লাশ দেয়া হয়। মিথ্যা কবর দেয়া হয়েছে। আমি যতবার এর জন্য প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি, আমাকে বলা হয়েছে, আমার স্বামীকে দেশদ্রোহী করা হবে।