জুলাই আন্দোলন

পা হারানোর দুঃখ নেই, সরকারি অবহেলায় ক্ষোভ

জুলাই আন্দোলনের মিছিলে এক কাতারে যোগ দিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গাড়ি চালক, দোকানি কিংবা কাপড় বিক্রেতা। তাদের অনেককেই গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। থেমে গেছে জীবনের চাকা। হাসপাতালেই বছর পেরিয়েছে অনেকের।

পা হারিয়ে নতুন জীবন যুদ্ধে নামতে হয় এসব যোদ্ধাদের। বন্ধ আয় রোজগার। আহতদের ক্ষোভ আর হতাশা, সরকার তাদের খবরই নিলো না। তাদের পা হারানোর দুঃখ নেই, আছে সরকারের অবহেলায় ক্ষোভ। জীবন সচল করতে কৃত্রিম পা প্রয়োজন হয়। বিনামূল্যে যা সরবরাহ করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। ফলোআপ চিকিৎসাও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

শ্যামলীর ব্র্যাক লিম্ব অ্যান্ড ব্রেস সেন্টারেই কথা হয় জুলাই আহতদের সাথে।

leg

সকাল ১০টায় সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদক দেখতে পান, পা হারানো  আহত কয়েক জন কৃত্রিম পায়ের সাথে শরীরকে মানিয়ে নেবার কঠিন পরিশ্রমে নেমেছেন। কাজটি সহজ নয়। কৃত্রিম পা লাগানো মাত্রই কেউ দৌড়াতে শুরু করবেন, ব্যাপারটা এতো সহজও নয়। বরং দরকার দীর্ঘ চেষ্টা আর ফিজিও থেরাপি।

কথা হচ্ছিলো পা হারানো অটোচালক, বগুড়ার শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। অটো চালাতেন গাজীপুরে। ১৬ জুলাই আহত হন। মিছিল আসছিলো, পুলিশের মাঝখানে পড়ে যান। পাশ কাটিয়ে অটো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখনি পুলিশের গুলি লাগে ডান পায়ের হাঁটুর নিচে। দুই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গিয়ে ছিলেন বগুড়া। এরপর ইনফেকশন হয়ে এবছরের ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে পা কেটে ফেলা হয়। ব্র্যাকে ফ্রি পা লাগিয়ে নিলেও আর পুরোনো কাজে ফেরা সম্ভব নয়। জুলাই ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছেন সহায়তা পাননি এখনো।

শফিকুল ইসলাম

নেত্রকোনার আকাশ মিয়া। নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড মিষ্টির দোকানের কাজ করতেন। ২০ জুলাই আন্দোলনে গুলি লাগে। এরপর শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার ছিলো না। রাত সাড়ে ৯টায় ৬ ঘণ্টা পর চিকিৎসা শুরু হয়। প্রথমেই ১ লাখ ১০ হাজার চায়। এরপর ২ দিনেই ৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দুইদিন পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে এখানে চিকিৎসা হবে না৷ পরে ট্রমা সেন্টার, বাংলাদেশ মেডিকেল, নিটোর হয়ে হৃদ্‌রোগ ইনিস্টিটিউটে ঠাঁই হয়। ওখানেই ২২ জুলাই চিকিৎসা শুরু হয়। ততক্ষণে পা সচল নেই। ২৩ জুলাই পঙ্গু হাসপাতালে পা কেটে ফেলা হয়। বলছিলেন, দেশের প্রয়োজনে আরেকটি পাও দিতে তিনি প্রস্তুত। তবে হতাশা সঠিক সহায়তা না পাবার।

নেত্রকোনার আকাশ মিয়া

জুলাই আন্দোলনে আহত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র রায়মুল ইসলাম ১৭ জুলাই থেকে শনির আখড়ায় আন্দোলনে যোগ দেন। ৫ আগস্ট দুপুরে শনির আখড়া থেকে কাজলা মুখী মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেসময় গুলিবিদ্ধ হন। একদিন পর যখন পা কাটার সিদ্ধান্ত আসে, কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।

রায়মুল ইসলাম

মাদারীপুরের জাকির শিকদার গুলশানে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। ১৮ জুলাই বাড্ডা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে আন্দোলনরত অবস্থায় পায়ে গুলি লাগে হঠাৎ করেই। অন্যরা  এগিয়ে এসে গামছা দিয়ে পা টা বেঁধে ফেলে রক্ত বন্ধ করতে। গুলি যখন পায় লাগে তখন ভেবেছিলেন রক্তক্ষরণে মারা যাবেন। সে সময় মা আর ছোট বোনকে একবার দেখতে মন চাইছিলো। ছোট বোন রানীকে ফোন করে জানান গুলি লেগেছে। নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে যান। ২১ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিকেলে থেকে পঙ্গু হাসপাতাল নিয়ে যেয়ে পা কেটে ফেলা হয় তার।

তিনি জানান, পা হারানোর দুঃখ নেই। কিন্তু সরকারের অবহেলা নিয়ে আছে ক্ষোভ। বলেন, সরকার ফ্রি চিকিৎসার কথা বললেও আমরা তা পাচ্ছি না। যেখানে প্রাপ্য সেখানে আমরা বঞ্চিত। আমরা ব্র্যাকের কাছ থেকেই পুনর্বাসনের প্রত্যাশা করছি। কারণ যখন ২৫ জুলাই হাসপাতালে ছিলাম তখনই ব্র্যাক থেকে যোগাযোগ করা হয় আমাদের সাথে।

জাকির শিকদার, জুলাই আন্দোলনে আহত

২০২৪ সালের জুলাইতে আহতদের চিকিৎসা শুরু করে ব্র্যাক লিম্ব অ্যান্ড ব্রেস সেন্টার বিএলবিসি। আগামী পাঁচ বছর বিনামূল্যে এই সেবা চলবে বলে জানিয়েছেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রধান ডা. শাহিনুল হক রিপন। এরমধ্যে বিনামূল্যে কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন করা হয়েছে ৩৭ জনের আর চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন ১৮৪ জন।

২৫০ জন আহতকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সহায়তাও দেবে বিএলবিসি। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে আহত ৪১৬ জনকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এত কিছুর পরও আহতরা প্রয়োজনে দেশের জন্য আরেকটি পা দিতে প্রস্তুত। তবে দেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় কিছুটা হতাশা তাদের কণ্ঠে।