সাহসী সাইদের গল্প: জীবন বাজি রেখে আগুন থেকে উদ্ধার করে শিশুদের

দুর্ঘটনা ঘটলেই চারপাশে লাইভ, ভিডিও, ছবি তোলার হিড়িক পড়ে যায়। রাস্তা আটকে কৌতূহলী ভিড়ের জন্যই হয়ত কেউ বেঁচে থাকার সুযোগ হারায়। মাইলস্টোন ট্রাজেডিতে উদ্ধারকারী আহত তরুণ সাইদ চিকিৎসা শেষে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে ছাড়া পেয়ে একাত্তরের কাছে একান্ত সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ জানান মানুষের এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের প্রতি। আর সাইদের বাবা জানান, ছেলে সারাজীবন এমন ভালো কাজেই ঝাপিয়ে পড়ুক।

উত্তরার অ্যারোনটিক্যাল ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ এর এয়ারক্রাফট মেইনটেনেন্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র কাজী আমজাদ মাহমুদ সাইদ। উড়োজাহাজের প্রতি রয়েছে আলাদা দুর্বলতা। ক্লাস শুরু দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে। বন্ধুদের নিয়ে মেট্রো ভবনের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলো। চোখের সামনে বিমান আছড়ে পড়ার ১ মিনিটের মধ্যে দৌড়ে পৌঁছে যায় স্কুল প্রাঙ্গণে। অংশ নেয় উদ্ধার কাজে। ১০ থেকে ১৫টা বাচ্চাকে উদ্ধার করে। 

কাজী মাহমুদ সাইদ। ছবি- একাত্তর।

সাইদ একাত্তরের কাছে সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন তিন ঘণ্টা ভেতরে ছিলাম উদ্ধার কাজে সেনাবাহিনীদের সাথে। তারপর আমাদেরকে বের করে দেয়া হয়। তখন আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল দোকানের সামনে গিয়ে পড়ে যাই, ওই সময় একজন আপু এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে অসুস্থ কিনা? তিনিই আমাকে উত্তর-আধুনিক মেডিকেলে নিয়ে যান। সেখান থেকে বন্ধুরা নিয়ে আসে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসকদের প্রতি আমার দারুন কৃতজ্ঞতা উনি যথেষ্ট পরিমাণে চেষ্টা করছেন। উনাদের চেষ্টার জন্যই আজ আমি এইখানে দাঁড়িয়ে। আমি এতটাই অসুস্থ ছিলাম যে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে এবং ডাক্তারের চেষ্টায় আজকে আমি বেঁচে আছি।

মা আমেনা বেগম, চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানান ছেলের সুচিকিৎসার জন্য। একাত্তরকে বলেন আমার কাছে ছেলের কাজ ভালো লেগেছে বাচ্চাদের জন্য জীবন দিতে চেষ্টা করছে বাচ্চাদেরকে বাঁচাইছে আমি  খুশি গর্ববোধ করি । ছেলে যেন এরকম আরো বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ায় সে প্রত্যাশা রাখেন মা আমেনা। 

 মা-বাবার সাথে সাইদ।

চাঁদপুরে মতলবের সোহেল মাহমুদ চাকরির জন্য চিটাগাং থাকলেও ঢাকায় থাকা ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় থাকেন সবসময়। ছেলের আহত হওয়ার ছয় ঘণ্টা পরে বন্ধুর থেকে খবর পান। তখন প্রশ্ন করেন কি হয়েছে, তারা বলল মাইলস্টোনের ওখানে উদ্ধার কাজে গিয়ে অসুস্থ হয়েছে। আমরা ওকে মেডিকেলে নিয়ে আসছি এখন অসুস্থ। প্রথম একটু খারাপ লেগেছিল আমার একমাত্র আশা ভরসার ছেলের কি হলো এই ভেবে। তারপর যখন সব বুঝলাম তখন একটা জিনিস অনুভব করলাম ছেলে আগেও বন্যা দুর্গতদের জন্য কাজ করছে এখনো মানুষের বিপদে গিয়ে পাশে দাঁড়াইছে। আমি তখন নিজেকেই এই বলে সান্ত্বনা দিলাম আমার দুই সন্তান। উদ্ধার কাজে এক ছেলের বিনিময়ে যদি দশটা মায়ের সন্তান বেঁচে যায় তাতেও কোন দুঃখ নেই।  

তিনি আরও বলেন, পরের দিন আমার স্ত্রীকে খবর দেওয়া হয়। সেদিনই ঢাকায় আসি। এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই ভালো নার্স ডাক্তার সবাই সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে যারা আহত হয়েছে তাদের সুস্থ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। ২১ তারিখ থেকে তারা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছে। 

 

ওই সময় নিজের জীবন নিয়ে কিছুই মনে হয়নি। ছোট শিশুদের আর্তচিৎকারে শুধু মনে হয়েছিল ওদের বাঁচাতে হবে। ছোট বাচ্চারা দৌড়াচ্ছিল শুধু ছবি তুলছে। আমাদের উচিত থেকে বেরিয়ে আসা। উচিত মানুষকে সাহায্য করা। জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে এই কারণে যে আমরা কাউকে সাহায্য না করি থেকে টেনে ধরি। সাইদের ক্ষোভ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব কিন্তু কাজে তা প্রমাণ হয় না। পুড়ে যাওয়া ছোট বাচ্চারা দৌঁড়াচ্ছিল, মানুষ ছবি তুলছিল। তার প্রশ্ন কেন মানুষ সহায়তা না করে

বিপরীতে সাইদের মতো হাজারো তরুণ সেদিন ছবি না তুলে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। বেঁচে যায় অনেক প্রাণ। জয় হোক সাইদদের।