পুরুষের চরিত্র কেন কঠোর বা আধিপত্যবাদীই হতে হবে!! পুরুষ কেন কাঁদতে পারবে না বা পুরুষের কেন আবেগী হতে যতো মানা ! কারণ জন্মের পর থেকেই ছেলেশিশুদের শেখানো হয়, ‘তুমি ছেলে, কাঁদবে না’, ‘মেয়ে হয়ে গেলি নাকি? এরই মধ্যে লুকয়ে আছে একটি গভীর প্রশ্ন, পুরুষের কান্না কি সত্যিই দুর্বলতার চিহ্ন? নাকি সমাজের চাপে দমিত এক মানবিক আবেগ?
দুনিয়ায় ঘটা করে বিচিত্র দিবস উদযাপনের অভাব নেই। কিন্তু পুরুষদের নিয়ে যে দিবস আছে, এটাই বা কতোজন জানেন! আয়োজন তো বহু দূরের কথা। তবুও মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) বিশ্বব্যাপী উদযাপন হচ্ছে আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। পরিবার, সমাজ ও পৃথিবীতে পুরুষের যে ইতিবাচক প্রভাব তা উদযাপন করার দিন। এ বছর পুরুষ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘পুরুষ এবং ছেলেদের সমর্থন করা।’ যদিও দিবসটি নিয়ে পক্ষ আর বিপক্ষে মত রয়েছে। সমাজের দৃষ্টি পুরুষদের ‘মাচো’/শক্তিশালী/কঠোর-ইমেজ তাদের নিজস্ব দুর্বলতা, আবেগ ও ব্যক্তিগত সংগ্রামকে গোপন করতে বাধ্য করে। এর ফলে পুরুষও ধীরে ধীরে এক মানসিক নিঃসঙ্গতার শিকার হয়- যার প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রেও।
কষ্ট পেলে চুপ থাকা, সর্বদা মুখে হাসি, আর নিজের দুর্বলতা আড়ালে রাখা সমাজের একমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যও প্রশ্ন মুখে দাঁড়িয়েছে। তারা অবসাদ, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যার মধ্যেও নীরব থেকে সঙ্কটে লড়াই করে যান একা, কোনো সহায়তা ছাড়াই; বলছিলেন ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মনোবিজ্ঞানীর মনিরা রহমান।
মনিরা বলেন, সমাজ এমন একটা রোলে সেট করে দিয়েছে যে, পুরুষ আসলে খুব শক্তিশালী, ভেঙে পড়তে পারবেনা, আবেগের বিষয়গুলো প্রকাশ করতে পারবেনা। সেগুলোকে অবদমন করতে করতে এক সময় এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পুরুষ একজন অত্যাচারী হয়ে উঠতে পারে। এই পুরুষটি জানেনা যে, সমাজে বা পরিবারে যখন একটা আবেগীয় অবস্থা তৈরি হচ্ছে তখন কীভাবে সেটা ম্যানেজ করবে। এই পরিস্থিতিতে সম্পর্কগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারী দিবস পালনের আদি প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পুরুষ দিবসকে এক করার পক্ষপাতী নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ।
ইমতিয়াজ বলেন, নারী দিবসের যে প্রেক্ষিত, নারী হাজার বছর ধরে সর্বক্ষেত্রে নির্যাতিত হয়েছে, পুরুষ আসলে সেটা হয়নি। সুতরাং পুরুষের জন্য কোনো বিশেষ দিবসের দরকার নেই। পুরুষকে সেলিব্রেট করার জন্য যেভাবে এটাকে দেখা হয়েছে বা যেভাবে এটা ঐতিহাসিকভাবে তৈরি হয়েছে এটাকে সরাসরি না বললেও নারী দিবসকে আন্ডার মাইন্ড করার জন্যই করা হয়েছে। সুতরাং এই ধরণার সঙ্গে একেবারেই আমি একমত না। সমস্যাটা হচ্ছে, আমরা এখানে পুরুষ হয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়াটা সমাজ আমাদের তৈরি করে দেয়, সেটা আসলে পুরুষদের অত্যাচারী করে তোলে।
পুরুষদের নিয়ে গবেষণা কেন্দ্র সেন্টার ফর ম্যান অ্যান্ডম্যাসকিউলিনিটিজ স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক তাহিয়া রহমান বলেন, পুরুষের জীবনের গভীর বাস্তবতা, অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম এবং চাপ ঢাকা পড়ে নিঃশব্দতার পর্দায়। তাই পুরুষের স্বাস্থ্য ও মানসিক উন্নয়ন সাধনে প্রয়োজন আছে দিবসটি পালনের। তাদের শোনাতে হবে মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়, লিঙ্গ নয়।
তাহিয়া বলেন, আমি বিশ্বাস করি পুরুষ দিবস অবশ্যই একটা ভালো ফলাফল নিয়ে আসবে। কিন্তু এটা একমাত্র সমাধান নয়। নারী যখন শিক্ষিত হয়ে উপার্জন করতে তখন কি সহিংসতা কমেছে? না, কমেনি। বরং বেড়েছে। কারণ সেই নারীকে গ্রহণ করার মতো পুরুষ আমরা তৈরি করতে পারিনি, আমাদের সমাজে ছিলো না। নারীর পাশাপাশি ঘরের কাজ করলে পৌরষের কিছু কমে যায় না।
দিবসের বিতর্ক থাকলেও প্রতিবছর বাংলাদেশে এই দিবস উদযাপন করে যাচ্ছে পুরুষ অধিকার ফাউন্ডেশন। সমাজের কাঠামো পুরুষকে শুধু দায়িত্ব পালনের যন্ত্রে পরিণত করে ফেলেছে- যেখানে তার মানবিক অনুভূতির কোনো স্বীকৃতি নেই। তারা বলছে, পুরুষ নানাভাবে নীরবে নির্যাতিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুরুষ অধিকার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ খায়রুল আলম বলেন, আমাদের কাছে অনেক পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু তারা এটা কারো কাছে প্রকাশ করতে পারছেন না। কেননা তা করলে মানুষ বিভিন্নভাবে তা নিয়ে উপহাস করে। এজন্য কখনও কখনও পুরুষ সব সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন। তাদেরও মান, অভিমান, আবেগ সবই আছে। কিন্তু যদি কোনো পুরুষ কাঁদে, তখন বলা হয়- এটা পুরুষের শোভা পায় না।
পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন নারীদের অধিকার ও সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছে, তেমনি পুরুষের আবেগহীন, দায়িত্বকেন্দ্রিক এক জীবনযাপনে আবদ্ধ করে রেখেছে। প্রয়োজন এমন সমাজব্যবস্থা, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা পাবে। পুরুষের কান্না দুর্বলতা নয়, তার মানবিক পরিচয়ের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম- এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা গড়ে তুলতে হবে ।