সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর পরিচয় প্রকাশ

সুদানের দক্ষিণ কর্দোফান অঞ্চলে শনিবার জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) স্থানীয় সময় বিকেলে আবিয়ে এলাকার একটি লজিস্টিকস বেসে এই হামলা হয়। এতে আরও আটজন আহত হয়েছেন। নিহত ছয় এবং আহত আটজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর পরিচয় প্রকাশ করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।

নিহত ছয় শান্তিরক্ষী হলেন– করপোরাল মাসুদ রানা (নাটোর), সৈনিক মমিনুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত মন্ডল (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) ও লন্ড্রি কর্মী সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)।

আহত আটজন হলেন– লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার খালেকুজজামান (কুষ্টিয়া), সার্জেন্ট মোস্তাকিম হোসেন (দিনাজপুর), করপোরাল আফরোজা পারভীন ইতি (ঢাকা), ল্যান্স করপোরাল মহিবুল ইসলাম (বরগুনা), সৈনিক মেজবাউল কবির (কুড়িগ্রাম), সৈনিক উম্মে হানী আক্তার (রংপুর), সৈনিক চুমকি আক্তার (মানিকগঞ্জ) ও সৈনিক মানাজির আহসান (নোয়াখালী)।

রোববার দেয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানিয়েছে, কাদুগলি লজিস্টিকস বেসে শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪০ থেকে ৩টা ৫০ মিনিটের মধ্যে এই হামলা চালানো হয়। একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী এই ড্রোন হামলা চালায়। এ সময় শান্তিরক্ষীরা বেসে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা বাহিনী (ইউনিসফা) জানিয়েছে, কাদুগলি শহরে তাদের ক্যাম্পে ড্রোন হামলায় ছয়জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর। নিহত সবাই বাংলাদেশি।

sudan

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই হামলাকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কর্দোফানে আজকের হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর জন্য অবশ্যই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি এ ঘটনায় ‘গভীরভাবে মর্মাহত’ এবং এতে ছয়জন নিহত ও আটজন আহত হওয়ার কথা জানান। ইউনুস আহতদের জরুরি সহায়তা দিতে জাতিসংঘকে অনুরোধ করেন। পাশাপাশি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এ কঠিন সময়ে নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবে।’ ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীরা সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যবর্তী বিতর্কিত অঞ্চল আবেই’তে মোতায়েন রয়েছে। একজন চিকিৎসক এএফপিকে জানান, কাদুগলিতে জাতিসংঘের একটি স্থাপনায় হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের জাতিসংঘের কর্মী বলে জানিয়েছেন।

সুদান সেনাবাহিনী তাদের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে ইউনিসফা ঘাঁটি থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়ার দু’টি কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।

পোর্ট সুদানে অবস্থানরত সেনাপন্থী সরকার এক বিবৃতিতে হামলার নিন্দা জানায় এবং এর জন্য আধাসামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-কে দায়ী করে।

সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বাধীন সার্বভৌমত্ব কাউন্সিল এক বিবৃতিতে হামলাটিকে ‘একটি বিপজ্জনক উস্কানি’ বলে অভিহিত করেছে।

এদিকে আরএসএফ টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, কাদুগলিতে জাতিসংঘের ক্যাম্পে হামলার অভিযোগ এবং আমাদের বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহারের যে দাবি করা হচ্ছে তা মিথ্যা।

এদিকে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিস বলেছেন, বিদ্রোহী মিলিশিয়া এখন সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার সব শর্ত পূরণ করেছে। তিনি হামলার দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে জাতিসংঘকে আহ্বান জানান।

কাদুগলি শহর গত দেড় বছর ধরে আরএসএফের অবরোধে রয়েছে। গত নভেম্বরে সেখানে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয় গত অক্টোবরে দারফুরের এল-ফাশের শহর দখলের পর আরএসএফ পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে তেলসমৃদ্ধ কর্দোফান অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। কর্দোফান তিনটি রাজ্যে বিভক্ত।

এ অঞ্চল কৃষি উৎপাদনে সমৃদ্ধ। পশ্চিমে আরএসএফ নিয়ন্ত্রিত দারফুর এবং উত্তর, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকার মাঝামাঝি অবস্থান করায় কর্দোফানের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

sudan1

আরএসএফ ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে এবং এই উর্বর অঞ্চলে যোদ্ধা, ড্রোন ও সহযোগী মিলিশিয়া মোতায়েন করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আরএসএফ প্রতিরক্ষা ভেদ করে মধ্য সুদানে প্রবেশ করতে চাইছে। এর মাধ্যমে তারা রাজধানী পুনর্দখলের পথ তৈরি করতে চায়।

জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া তথ্য অনুসারে, গত সপ্তাহে দক্ষিণ কর্দোফানের কালোগি শহরে একটি কিন্ডারগার্ডেন ও হাসপাতালে হামলায় ৬৩ জন শিশুসহ ১১৪ জন নিহত হয়। সুদানের চলমান যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকের পর যুদ্ধ শেষ করতে উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণা দেন। তবে তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।