১৭ বছর পর রুদ্ধদ্বার ভেঙে ভোট উৎসবে বাংলাদেশ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর অবাধ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে এক উৎসবমুখর আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে জেনারেশন জেড বা 'জেন-জি'র নেতৃত্বাধীন এক গণ-অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশটির স্থিতিশীল শাসনের জন্য একটি চূড়ান্ত ফলাফল অত্যন্ত জরুরি। হাসিনাবিরোধী সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন দেশজুড়ে কয়েক মাস ধরে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল, যার প্রভাব পড়েছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাতসহ প্রধান শিল্পগুলোতে।

নেপালের আগামী মাসের নির্বাচনের আগে, এটিই বিশ্বের প্রথম নির্বাচন যা অনূর্ধ্ব-৩০ বা জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন কোনো অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ছবি: রয়টার্স
এবারের লড়াই মূলত সাবেক দুই মিত্র- বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের মধ্যে। জনমত জরিপগুলোতে বিএনপিকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে দেখা গেছে।

রাজধানী ঢাকায় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ভোটকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ৩৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন বলেন, তিনি সবশেষ ভোট দিয়েছিলেন ২০০৮ সালে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত জোবায়ের বলেন, ১৭ বছর পর আমরা মুক্ত পরিবেশে ভোট দিচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে আমাদের ভোটের মূল্য আছে।

ভোটারদের এই আনন্দের প্রতিফলন দেখা গেছে ঢাকার বাইরেও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ভোট দিতে আসা পেশায় চালক কামাল চৌধুরী বলেন, এখানে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মানুষ এত উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে আসছে যে মনে হচ্ছে আজ ঈদের দিন। একটি কেন্দ্রের বাইরে ঘোড়ায় চড়া পুলিশের জিনের ওপর লেখা ছিল, পুলিশ আছে পাশে, ভোট দিন নির্ভয়ে। ঢাকার এই কেন্দ্রে বিএনপি নেতা তারেক রহমান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভোট দেন।

হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং তিনি দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো বিরোধী দলের বর্জন এবং ভয়ভীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ লাইন ও কঠোর নিরাপত্তা:
এবারের নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের বিপরীতে রেকর্ড সংখ্যক ২,০০০-এর বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। একজনের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে একটি রেকর্ড।

প্রধানমন্ত্রী পদের প্রধান দুই দাবিদার হলেন বিএনপির তারেক রহমান এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ভোট দেয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আজ থেকে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি একটি উৎসব, মুক্তির দিন এবং আমাদের দুঃস্বপ্নের অবসান। আমি আপনাদের সবাইকে অভিনন্দন জানাই।

সারাদেশে উৎসবমুখর ভোটগ্রহণের খবর পাওয়া গেলেও খুলনায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে এক বিএনপি নেতার মৃত্যু এবং গোপালগঞ্জে একটি হাতবোমা বিস্ফোরণে দুই আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য ও এক কিশোরী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সারাদেশে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

ছবি; রয়টার্স
গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কার:
নির্বাচনের পাশাপাশি বেশ কিছু সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোট হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ওপর দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণ।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালটেন্ট থমাস কিন বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন বড় পরীক্ষা হলো একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং সব পক্ষ কর্তৃক ফল মেনে নেয়া। এটি সফল হলে প্রমাণিত হবে যে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক নবজাগরণের পথে পা বাড়িয়েছে।


ভোটগ্রহণ ও ফলাফল:
ভোটগ্রহণ শেষ হবে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে। এর পরপরই গণনা শুরু হবে এবং মধ্যরাত নাগাদ প্রাথমিক ট্রেন্ড জানা যাবে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের মতে, শুক্রবার সকালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল স্পষ্ট হতে পারে।

দেশের মোট ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী, যদিও নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৮৩ জন। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ এবারই প্রথম ভোট দিচ্ছেন। তথ্য সূত্র: রয়টার্স