নিজ নিজ কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার সকালেই ভোট দিয়েছেন বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি নেতারা। ভোটের পরিবেশকে সার্বিকভাবে ভালো বলেছেন তারা। ভোট সুষ্ঠু হলে ফল মেনে নেয়ার ঘোষণাও দেন, দলগুলোর নেতারা। এজন্য প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করার আহবান তাদের।
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম।
ভোট দেয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব বর্তমান নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, অনেক বাধা-বিপত্তি, রক্তপাত এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আজকের এই দিনটি এসেছে।
তিনি মনে করেন যে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ হবে। দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে ফখরুল বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ আন্দোলনের পর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এবং এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পুলিশের হাতে নির্যাতিত ও গুমের শিকার হয়েছেন।
বিশেষ করে চব্বিশের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা ও কৃষকদের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত ত্যাগের পর এই নির্বাচন আয়োজনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটা নতুন অধ্যায় শুরু করবে।
সকাল সোয়া ৮টার দিকে কক্সবাজারের পেকুয়া জিএমসি ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ।
ভোট দেওয়া শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভোট দিতে পেরে আমি অনেক আনন্দিত। আমার এই অনুভূতি প্রকাশ করার মতো না। দীর্ঘ ১৭ বছর এরকম একটা মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, যাতে সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন। আমি আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ এই এলাকার মানুষ উন্নয়নের স্বার্থে, সমৃদ্ধির স্বার্থে ধানের শীষের পক্ষে রায় দেবেন।
এর আগে সকাল আটটার দিকে ভোটারদের সারিতে দাঁড়ান সালাহউদ্দিন আহমদ। তখন তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমি ভোটার লাইনে দাঁড়িয়েছি, এটা অত্যন্ত আনন্দের। এ দেশের মানুষ এই ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে, মার খেয়েছে, রক্ত দিয়েছে। সেই ভোটাধিকার আজ প্রয়োগ হচ্ছে। মানুষ উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে আসছেন। এই যাত্রায় আমরা নতুন বাংলাদেশ পাব।
জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান রাজধানী ঢাকার মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। সকাল সাড়ে আটটায় তিনি ভোট দেন। ভোট দেয়ার পর তিনি বলেন, ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে সেই রায় আমরা মানব। অন্যদেরও তা মানতে হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগ দেশবাসী কোনো ভোট দিতে পারেনি, আমিও পারিনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। তিনটি ভোট হারানোর পর আল্লাহ আজ আমাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্বাস করি, শুধু আমি নই, বিশেষ করে যুবসমাজ- যারা জীবনে একটা ভোটও দিতে পারেনি- তারা আজকের এই ভোটের জন্য বড় অপেক্ষায় ছিল। এই ভোট শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, সন্ত্রাস ও দখলমুক্ত হোক। এটি যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সেই দোয়া করি।
ভোটের পরিবেশ নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আমি কেবল কেন্দ্রে এসে ভোট দিলাম। বাকি কেন্দ্রগুলো দেখব, সারা দেশের খবর নেব। ছোটখাটো বিষয় হলে আমরা অবশ্যই ইগনোর করব। কিন্তু বড় কোনো বিষয় হলে ছাড় দেব না। মানুষের ভোটের অধিকার হারিয়ে যাক, এটা আমরা কোনোভাবেই চাই না।
তিনি বলেন, আগামীতে এমন সরকার গঠিত হোক, যে সরকার কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের হবে না; বরং ১৮ কোটি মানুষের সরকার হবে। আমরা সেই সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদী।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনার ফুলতলা উপজেলার ৮ নম্বর পশ্চিম শিরোমণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন তিনি।
পরিবর্তিত বাংলাদেশে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিচ্ছে, এই ভোটের পরে আরেকটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ মানুষ উপহার পাবে বলে আশা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে শত শত মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে তারা হাসিমুখে ভোট দিচ্ছে এবং আমি তার মধ্য দিয়ে একজন ভোটার হিসেবে ভোট দিতে পারলাম। এটা তো একটা পরিবর্তিত বাংলাদেশ। আশা করি ভোটের পরে আরেকটা পরিবর্তিত বাংলাদেশ, ইনশাআল্লাহ এই জাতি উপহার পাবে।
সকাল আটটার দিকে রাজধানীর বেরাইদের এ কে এম রহমতুল্লাহ কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন নাহিদ ইসলাম। এরপর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ১১ দলীয় জোট সরকার গঠনের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে। আমরা মনে করছি, আমরা সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি।
তিনি বলেন, আমি সবাইকে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাই। গত ১৬ বছরে সুষ্ঠুভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফেরার সুযোগ এসেছে। ভিন্ন স্থানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে এনসিপি নেতা বলেন, বিভিন্ন এলাকায় আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে আমরা এসব প্রতিকূলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমরা ভোটকেন্দ্র পাহারা দেব।
সকালে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন তাঁর মা রোকেয়া বেগমকে নিয়ে রংপুরের কাউনিয়ার ভায়েরহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের শহীদ ও যাঁরা গাজী আছেন, তাঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই এই নতুন বাংলাদেশে আজ ভোট দেওয়ার মতো একটি সুযোগ বাংলাদেশের জনগণ পেয়েছে।
আখতার অভিযোগ করে বলেন, বুধবার রাত থেকে বিভিন্ন জায়গায় কিছু অনিয়ম আমাদের চোখে ধরা পড়েছে। মারামারির মতো ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন জায়গায় অনেককে হেনস্তা করা হয়েছে। মারধর করা হয়েছে। শাপলা কলির সমর্থক, দাঁড়িপাল্লার সমর্থক যাঁরা আছেন, ১১ দলের সমর্থকদের ওপর হুমকি-ধমকি, মারামারি ও রক্তপাত ঘটানো হয়েছে। এই বিষয়গুলো আমাদের নানাভাবে শঙ্কিত করে তুলছে।
সকাল ৮টা ১০ মিনিটে দেবীদ্বার উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের গোপালনগর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেয়ার পর এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। হাসনাত বলেন, আমাদের জেনারেশন জেড যারা আছে, এটা তাদের প্রথম ভোট। কারণ, তারা আগে ভোট দিতে পারেনি। আমার আসনের অন্তত ১ লাখ ৩০ হাজার ভোটারের প্রথম ভোট এই নির্বাচন।
তিনি বলেছেন, যত বেলা গড়াবে, ততই বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে যাবো আমরা। ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। হাসনাত বলেন, সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং এখন পর্যন্ত কোথাও টেকনিক্যাল কিংবা প্রক্রিয়াগত কোনো জটিলতার খবর তাঁর কাছে আসেনি।