জয়-পরাজয়ের হিসাব শেষে বাংলাদেশের সামনে কি?

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম ঐতিহাসিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় ঘোষণা করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শুক্রবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে প্রকাশিত সবশেষ ফলাফলে দেখা গেছে, ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতেই জয়লাভ করেছে বিএনপি।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামী তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সেরা ফলাফল করেছে। ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদে (যার মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত আসন) ৬৮টি আসন পেয়ে তারা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসন পেয়ে তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। দলটির নেতা নাহিদ ইসলাম নিজ আসনে জয়ী হয়ে নতুন সংসদের অন্যতম কনিষ্ঠ সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। এনসিপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।


গত ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর দল আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের লক্ষ্যে 'জুলাই সনদ' নিয়ে একটি জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।

ইসির তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে ৫৯.৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নির্বাচনের ফলাফল এক নজরে- বিএনপি ২০৯ আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬ আসন, অন্যান্য দল ৭ আসন এবং স্বতন্ত্র ৭ আসন

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে বিএনপি তাদের মিডিয়া পেজের মাধ্যমে জয়ের দাবি জানিয়ে লেখে, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।  দলটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বিজয় উদযাপনে কোনো র‍্যালি বা মিছিল করবে না, বরং দেশব্যাপী জুমার নামাজের পর মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডন থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর তিনিই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।

ছবি: সংগৃহীত
ফলাফল কারচুপির আশঙ্কা?

নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও এনসিপি এবং বিএনপি ফলাফল কারচুপির অভিযোগ তুলেছে এবং দাবি করেছে, কোনো কোনো দল 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং'-এর সুবিধা নিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীও তাদের ফেসবুক পেজে বেসরকারি ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়, ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের রহস্যজনকভাবে স্বল্প ব্যবধানে পরাজয়, বেসরকারি ফলাফলে অসঙ্গতি এবং ইসির ভোটার উপস্থিতির হার প্রকাশে অনীহা ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দলটি তাদের কর্মীদের চূড়ান্ত ফলাফল পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে।

ছবি: রয়টার্স
কে জিতলেন, কে হারলেন?

তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬- উভয় আসনেই বিজয়ী হয়েছেন। জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জয়ী হয়েছেন। এছাড়া উল্লেখযোগ্য জয়ীদের মধ্যে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, মির্জা আব্বাস, ফজলুর রহমান, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জয় পেয়েছেন রুমিন ফারহানা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল আল জাজিরাকে বলেন, বিএনপি ও তার মিত্রদের জয় অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল। তারেক রহমানের ফিরে আসা দলের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

ছবি: সংগৃহীত
গণভোট ও জুলাই সনদ

সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা 'জুলাই সনদ'-এর পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৬০.২৬ শতাংশ ভোটার এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া করা এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবসহ ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
পরবর্তী ধাপ কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি আল জাজিরাকে বলেন, বিএনপির এই জয় একটি গণতান্ত্রিক শক্তির জয়। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা অনুযায়ী একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা গত নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত তাঁকে ফেরত না পাঠানোয় দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।