চার গ্রাম ইউরেনিয়ামে জ্বলবে হাজারো বাতি

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পা রেখে এক নতুন যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। পাবনার পদ্মা নদীর তীরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি সংযোজন শুরু হওয়ার মাধ্যমে দেশ এখন জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অসীম শক্তির সোপানে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর জ্বালানি সক্ষমতা; যেখানে একটি সাধারণ গাড়ি পূর্ণ করতে কয়েক লিটার ডিজেল লাগে, সেখানে রূপপুরের মাত্র সাড়ে ৪ গ্রামের একটি ক্ষুদ্র ইউরেনিয়াম পেলেট প্রায় ৪১৭ লিটার ডিজেলের সমান শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম।


ইউরেনিয়াম পেলেটের অবিশ্বাস্য শক্তি:
নিউক্লিয়ার ফুয়েলের কার্যক্ষমতা প্রচলিত জ্বালানির তুলনায় বহুগুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা জানান, সাড়ে ৪ গ্রাম ওজনের একটি মাত্র ইউরেনিয়াম পেলেট থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পেতে ৪০০ কেজি কয়লা বা ৩৬০ ঘনমিটার গ্যাসের প্রয়োজন হতো।

অর্থাৎ, মাত্র এক কেজি পারমাণবিক জ্বালানি প্রায় ৬০ টন জ্বালানি তেল অথবা ১০০ টন কয়লার সমান শক্তি জোগাতে পারে। খনির আকরিক থেকে প্রক্রিয়াজাত করা ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ এই পেলেটগুলো মূলত পারমাণবিক চুল্লিতে 'ফিশন' নামক এক নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। সেই তাপে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমেই তৈরি হয় বিদ্যুৎ।


নিরাপত্তার বহুস্তর বিশিষ্ট সুরক্ষা:
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে জনমনে তেজস্ক্রিয়তার উদ্বেগ থাকলেও রূপপুরে গ্রহণ করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তার প্রথম ধাপই হলো ফুয়েল পেলেট, যা এমনভাবে তৈরি যে তেজস্ক্রিয়তা এর ভেতরেই আবদ্ধ থাকে।

দ্বিতীয় ধাপে, এই পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি নিশ্ছিদ্র ধাতব টিউবে (ফুয়েল রড) সংরক্ষিত থাকে। অনেকগুলো ফুয়েল রড মিলে তৈরি হয় একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। রূপপুরের ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রতিটি চুল্লিতে এ রকম ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হবে। এই বহুস্তর বিশিষ্ট সুরক্ষার কারণে পরিবেশ বা জনপদে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই।


পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী সমাধান:
তেল, গ্যাস বা কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস নির্গত হলেও পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পূর্ণ নির্মল ও পরিবেশবান্ধব। এটি একটি নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি ব্যবস্থা। এছাড়া ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি থেকে পুনরায় শক্তি আহরণ করা যায় বলে অনেকে একে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কাতারেও ফেলেন।

রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল বিদ্যুতের ঘাটতিই মেটাবে না, বরং সাশ্রয়ী ও কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজেদের নাম লিখিয়েছে। আজ থেকে শুরু হওয়া এই জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম মূলত উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ক্ষণগণনা।