ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান দেশের কৃষি, শিক্ষা এবং নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি স্মার্ট ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকার দ্রুততার সঙ্গে 'কৃষক কার্ড' চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, শুধু ধান চাষি নয়, বরং মৎস্য চাষি এবং গবাদি পশু পালনকারীসহ কৃষি খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক স্তরের মানুষের কাছে সরকার পর্যায়ক্রমে পৌঁছাবে। কৃষকদের এই উন্নয়নের ধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে 'ফ্যামিলি কার্ড' কার্যক্রমের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
নিজের প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান পরিবেশ পরিবর্তনের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিদেশের উন্নত শিক্ষা পরিবেশ দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে চান। এই লক্ষ্যে আগামী জুলাই মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে স্কুল ব্যাগ, ড্রেস এবং জুতা প্রদানের ঘোষণা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর মতে, শিক্ষার্থীরা যেন একটি সম্মানজনক ও মানসম্মত পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।
নারী শিক্ষার প্রসারে এক ঐতিহাসিক ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, এর আগে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছিল, আর এবার সেই সুবিধা স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন থেকে দেশের নারীরা স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারবেন এবং মেধার ভিত্তিতে বিশেষ উপবৃত্তির সুবিধাও পাবেন। নারীদের অবজ্ঞা করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি একে সরকারের বড় এক 'বিনিয়োগ' হিসেবে অভিহিত করেন।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদ ও আত্মত্যাগকারীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষ মুক্তভাবে কথা বলবে এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাবে; সেই স্বপ্ন পূরণ করাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বর্তমান সংসদকে ফ্যাসিবাদমুক্ত ও জনগণের অধিকার রক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বর্ণনা করেন।
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিরোধী দলের দেওয়া গঠনমূলক প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করেছে এবং সমস্যা সমাধানে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
পরিশেষে, তারেক রহমান সংসদকে একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার করেন এবং জনকল্যাণকেই বর্তমান সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নয়নমুখী শাসনব্যবস্থার প্রতিফলন ফুটে উঠেছে।