ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ করার আগ্রহ দেখালেন প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘ দুই দশক পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী নজরুল জন্মজয়ন্তী উৎসব। শনিবার বিকেলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি ত্রিশালকে একটি আধুনিক ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আক্ষেপ ও গৌরব মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, ২০০৬ সালের পর থেকে ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে কোনো নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করা হয়নি। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এই গৌরবোজ্জ্বল আয়োজন করতে পেরে বর্তমান সরকার অত্যন্ত গর্ববোধ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যদি আমরা গভীর শ্রদ্ধায় বরণ ও স্মরণ করতে না পারি, তবে সেটি জাতি হিসেবে আমাদেরই চরম সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দৈন্যতা।

Priminister 01
বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী কবির শৈশবের সেই দুর্দিনের পরম সুহৃদদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহকে, যিনি ১৯১৪ সালে বালক নজরুলকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে পিতৃস্নেহে আগলে রেখেছিলেন।

ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৬ সালে জাতীয় কবির প্রয়াণের পর তাঁর নামাজে জানাজা শেষে মরদেহ বহনকারীদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এছাড়া ১৯৭৯ সালের ২৫ মে কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহাসিক র‍্যালিতেও তিনি নিজে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশালের মাটিতে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করে নজরুলের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেন।

Priminister 02
দেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা দেশের বিচার বিভাগসহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে এর চেয়েও বড় ও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে আমাদের আবহমানকালের মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের। মিরপুরে সম্প্রতি একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম ও পৈশাচিক মৃত্যু প্রমাণ করে আমাদের মানবিক অবক্ষয় আজ কোন চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। কবির সাম্য ও মানবতার কালজয়ী আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই আজ সমাজে এই ভয়াবহ পতন ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

একটি নিরাপদ, স্বৈরাচারমুক্ত ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে টেকসই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যগত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন ঘটানো আজ সময়ের দাবি।

বিশ্বদরবারে কবির জীবনদর্শন ছড়িয়ে দেয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের উদয়। তিনি ছিলেন নারী অধিকার, মেহনতি মানুষের কল্যাণ আর অসাম্প্রদায়িক বিশ্বমানবতার এক অনন্য ফেরিওয়ালা। তাঁর স্মৃতিকে চিরকাল অম্লান ও জীবন্ত রাখতে ত্রিশালকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ 'নজরুল সিটি' হিসেবে ঘোষণা করা যায় কি না, সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিভাগের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।

Priminister
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন, বাংলাদেশ ও নজরুল মূলত একই অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। জাতীয় কবির জন্মদিনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আসুন আমরা সবাই মিলে অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও দারিদ্র্যের গ্লানি মুছে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিজেদের উৎসর্গ করি।

প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক ও ঐতিহাসিক বক্তব্যের পরপরই তিনি জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী উৎসবের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনের পর থেকেই কবিপ্রেমী ও স্থানীয় জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো ত্রিশাল জুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।