২০২৪ সালে স্বৈরাচারবিরোধী জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে ছাত্র-জনতা গণহত্যার বিচার এবার চূড়ান্ত পর্বের দ্বারপ্রান্তে! ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং শীর্ষ সাত চ্যালাচামুন্ডার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তির পর্ব শেষ হয়েছে। আদালত রায় ঘোষণার জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ রেখেছেন, যে কোনো দিন আসবে ঐতিহাসিক রায়।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে চলে টানটান উত্তেজনার আইনি লড়াই। একদিকে রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর ও অন্য আইনজীবীদের আসামিদের সর্বোচ্চ ফাঁসির দাবি, অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালে এসে কাঠগড়ায় অনুপস্থিত পলাতক নেতাদের বাঁচানোর জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আজব সব ওজর-আপত্তি!
আইনগত যুক্তি তুলে ধরে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম অডিও-ভিডিওর ঝুড়ি খুলে ট্রাইব্যুনালকে স্পষ্ট দেখান, কীভাবে আন্দোলনের শুরু থেকেই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৈঠক ডেকে মানুষ মারার নীল নকশা আঁকা হয়েছিল। তিনি মনে করিয়ে দেন, ওবায়দুল কাদেরই সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারীদের ‘দেখামাত্র গুলির’ পৈশাচিক নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে ঝরেছে হাজারো তাজা প্রাণ।
তবে কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আসা আইনজীবী এম হাসান ইমাম যে সাফাই গাইলেন, তাতে আদালত কক্ষে অনেকেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছেন! আইনজীবীর দাবি, জনগণের জানমাল রক্ষায় শুট অ্যাট সাইটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল! আর, সবচেয়ে হাস্যকর দাবি হলো, ওবায়দুল কাদের বা বাকিরা নাকি কোনো কমান্ডিং পজিশনেই ছিলেন না! নির্দেশ সব শেখ হাসিনার মুখ থেকেই বেরিয়েছিল, অতএব তাদের কোনো দোষ নেই! সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে ওবায়দুল কাদেরকে নির্দোষ প্রমাণের এই মরিয়া চেষ্টা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত সবাইকে চমকে দেয়।
ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইনান, যুবলীগ সভাপতি পরশ ও সাধারণ সম্পাদক নিখিলের আইনজীবী ইশরাত জাহান তো আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করে বসলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি এই চারজন নেতৃত্বই দেননি! আর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কেন ধ্বংসযজ্ঞ চালাল? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা ছিল, তাই কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ পাননি তারা!
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী ও ক্যাডারদের হাতে নারী শিক্ষার্থীদের রক্তাত হওয়ার অসংখ্য ছবি-ভিডিও বিশ্বজুড়ে তোলপাড় ফেললেও, এই আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে দাবি করেন, মামলায় কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি, সুতরাং নারীদের ওপর আদৌ হামলা হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে! এ কথা বলে তিনি চার আসামিরই বেকসুর খালাস প্রার্থনা করেন।
আসামিপক্ষের এই সব বয়ান ও সাফাইয়ের জবাব দিতে উঠে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম আইনি ফাঁদ বা ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর ধারালো ব্যাখ্যা দাঁড় করান। তিনি ট্রাইব্যুনালকে মনে করিয়ে দেন, এই চক্রান্তমূলক মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত হয়ে নেমে যদি একজন মানুষও মারা যায়, তবে এই যৌথ অপরাধের অংশীদার হিসেবে প্রত্যেক আসামিই সমভাবে অপরাধী বলে গণ্য হবেন। পালিয়ে থাকা সাতজনই এই গণহত্যার সমান মাস্টারমাইন্ড।
এর আগে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিটিই শতভাগ প্রমাণ করতে পেরেছে প্রসিকিউশন। এই পলাতক আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন, তাদের ফাঁসিই একমাত্র পাওনা!
সাক্ষ্যপ্রমাণ, অডিও-ভিডিও আর ২৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ শেষে ট্রাইব্যুনাল এখন রায়ের প্রহর গুনছেন। সব চোখ এখন ট্রাইব্যুনালের দিকে, জুলাইয়ের রক্তস্নাত শহীদের আত্মা আর আহতদের চিৎকার আইনি বিচারে কতটা বিচার পায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়!