জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে এটিই তার প্রথম ভাষণ হতে যাচ্ছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ছয়টা সাত মিনিটে তার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টায় নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তিন প্রজন্মের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা
পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। এর আগে তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পরিবারের তিন প্রজন্মের এই বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।
সফরে ৩৫ জনের প্রতিনিধিদল
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ ৩৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিউইয়র্ক সফর করছেন। এই প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্র, অর্থ, আইন ও পর্যটন—এই চার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং একাধিক প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সফরসঙ্গী হয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সচিবালয় প্রতিনিধি মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।
২৪ সেপ্টেম্বর মূল ভাষণ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। তিনি বাংলায় এই ভাষণ দেবেন। ভাষণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং যুব ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।
একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান ও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জোরদারভাবে তুলে ধরবেন তিনি।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত সূচি
নিউইয়র্ক পৌঁছানোর পর ২২ সেপ্টেম্বর সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করবেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিন সন্ধ্যায় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সফরের দ্বিতীয় দিন ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানবিক ও দাতব্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সঙ্কট মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য রাখবেন। বিকেলে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনা এবং বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক বিশেষ সম্মেলনে অংশ নেবেন তিনি।
২৪ সেপ্টেম্বর সকালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি সংক্রান্ত সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যের পর জাতিসংঘ সাধারণ বিতর্কের মূল পর্বে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি
জাতিসংঘ অধিবেশনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও জোর দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। নিউইয়র্কেই ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারী এবং তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন তিনি। এসব বৈঠকে দেশে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অংশ হিসেবে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, ভুটান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সফরসূচিতে সময় কম থাকায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠান বাতিল করা হলেও, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার মাধ্যমে এ সফর সফল হবে বলেই প্রত্যাশা করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
সফর শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তার দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।