মায়ের চোখে তখনও সন্তানের ফেরার অপেক্ষা। স্কুলের পোশাকটা হয়তো আলমারিতে পড়ে আছে, বই-খাতাও পড়ে আছে ঘরের কোনো এক কোণে। অথচ যে শিশুটি একদিন ইতালির স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়ার পথে পা বাড়িয়েছিলো, সে এখন কোথায়? জীবিত, নাকি ভূমধ্যসাগরের গভীর জলে হারিয়ে গেছে জানেন না স্বজনেরা। বলছি মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কমলের ( ছদ্মনাম) কথা। এসএসসি দেওয়ার আগেই পরিবারের হাল ধরতে পাড়ি দেয় লিবিয়ায়। সেখান থেকে নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি। তবে তার স্বপ্নের সাথে নিজেও ডুবে মারা যায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এমন অপেক্ষা এখন শুধু একটি পরিবারের নয়। মাদারীপুরের বহু পরিবারে ইউরোপের স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে আতঙ্কে। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের কেউ কেউ দালালের হাত ধরে পাড়ি দিচ্ছে লিবিয়ায়। এরপর শুরু হচ্ছে এমন এক যাত্রা, যার শেষ হতে পারে মরুভূমিতে, পাচারকারীর বন্দিশালায় কিংবা ভূমধ্যসাগরের অতল জলে।
এই পথ যে কতোটা ভয়ঙ্কর, তার প্রমাণ আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেই। ইউনিসেফের হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইতালির উদ্দেশে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে প্রায় তিন হাজার ৫০০ শিশু মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। অর্থাৎ গত এক দশকে গড়ে প্রতিদিনই একটি শিশুর জীবন হারিয়েছে বা তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আর বাংলাদেশিদের জন্য লিবিয়া এখন শুধু ইউরোপে যাওয়ার ট্রানজিট নয়, অনেকের জন্য হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। ২০২৫ সালের জাতিসংঘের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরীয় পথে ইউরোপে পৌঁছানো শিশুদের বড়ো একটি অংশ একা বা অভিভাবকহীন অবস্থায় যাত্রা করেছে; বাংলাদেশও এই যাত্রাপথে শিশুদের অন্যতম উৎসদেশ। লিবিয়ায় তাদের অনেকেই শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, জোরপূর্বক শ্রম ও আটকের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
স্কুলে থাকার বয়সেই বিদেশযাত্রা
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কে জে এস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্রটি যেন এই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার জন্য বিদ্যালয়টিতে নিবন্ধন করেছিলো ১৬৩ শিক্ষার্থী। কিন্তু চূড়ান্তভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে ১৪৮ জন। বাকি ২৫ শিক্ষার্থী কোথায়?খোঁজ নিতে গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তারা ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছে।
যে বয়সে তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, সেই বয়সেই তারা পাড়ি দিয়েছে এমন একটি পথে, যেখানে তাদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জানান, অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই শিক্ষার্থী ঝরে পড়া শুরু হয়। নবম থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার সময় এই প্রবণতা আরও বাড়ে।
একই উপজেলার ইসুবপুর উচ্চ বিদ্যালয়েও প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। তাদের অনেকের লক্ষ্য লিবিয়া হয়ে ইতালি। অথচ ইতালির স্বপ্নে দেশ ছাড়ার পর এই স্কুলেরই এক সাবেক শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের ভাষায়, এটি এখন এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। একজনের সন্তান ইতালি গেলে অন্য অভিভাবকরাও তাদের সন্তানকে ইউরোপে পাঠাতে মরিয়া হয়ে উঠছেন।
কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে শিশুরা যাদের অনেকেই জানেই না, ইউরোপের স্বপ্নের আড়ালে তাদের জন্য কী ভয়াবহ বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।
‘আমারে পাঠায় দাও’
শুধু রাজৈর নয়, মাদারীপুরের বিভিন্ন উপজেলার স্কুলগুলোতেও একই চিত্র। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো এলাকায় ২০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। বিদেশ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এর অন্যতম কারণ।কালকিনির একটি বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জানান, অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার বদলে বিদেশ যাওয়াকে ভবিষ্যতের পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। শিক্ষকেরা বোঝানোর চেষ্টা করলেও তাদের অনেকের একটাই কথা, বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে।
এক অভিভাবকের অভিজ্ঞতা
এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর তার ছেলে লিবিয়া যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে। শিশুটির চোখে তখন ইউরোপের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যে তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা হয়তো সে জানে নশেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দালাল ধরে মৃত্যু কূপে ঠেলে দেন অসহায় বাবা। অবশ্যই সেই শিশুটি সাগর পাড়ি দিয়ে পৌছাতে পেরেছিল তীরে।
শিশুর হাতে পাসপোর্ট, পেছনে কারা?
১৪, ১৫ কিংবা ১৬ বছরের একটি শিশু কীভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ছে? কীভাবে হচ্ছে তার পাসপোর্ট? কে তাকে লিবিয়া পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে? আর কারা তার পরিবারকে ইউরোপের স্বপ্ন দেখাচ্ছে? অনুসন্ধান বলছে, সংঘবদ্ধ চক্র ভুয়া জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বয়স বাড়িয়ে পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দালালচক্র এবং সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু ব্যক্তির সম্পৃক্ততাও রয়েছে।
কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, জন্মনিবন্ধনসহ সরকারি সেবাগুলো দালালমুক্ত রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘লিবিয়ায় শুরু হয় আরেক ভয়াবহ অধ্যায়’
বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পৌঁছানোর পরও শিশুদের বিপদ শেষ হয় না। বরং অনেকের জন্য সেখান থেকেই শুরু হয় আরও ভয়াবহ অধ্যায়।
পাচারকারীদের হাতে বন্দি হওয়া, মুক্তিপণের জন্য পরিবারের ওপর চাপ, নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম।সবই এই রুটে নথিভুক্ত বাস্তবতা। বাংলাদেশের নাগরিকদের লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই বড়ো আকার ধারণ করেছে। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালেই ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে ইতালিতে পৌঁছেছিলো; একই সময়ে হাজারো বাংলাদেশি লিবিয়ায় অবস্থান করছিলো এবং অনেকে সমুদ্রপথে আটক হয়ে লিবিয়ায় ফেরত যায়।
২০২৬ সালেও এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ থামেনি। সম্প্রতি লিবিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশে যাওয়া নৌযান ডুবিতে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনায় মাদারীপুরের রাজৈর থেকে মানব পাচারচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। ওই ঘটনায় আট বাংলাদেশি মারা যায়। তদন্তে উঠে এসেছে, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার পর তাদের অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে পাঠানো হয়েছিলো।
তাহলে প্রশ্ন আরও বড়ো হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদেরই এই পথে জীবন দিতে হচ্ছে, সেখানে শিশুদের আমরা কোন নিশ্চয়তায় এই পথে যেতে দিচ্ছি?
একটি শিশুর স্বপ্ন কি মৃত্যুর ঝুঁকি নেওয়ার নাম?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু স্কুল থেকে ঝরে পড়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশু অধিকার, মানব পাচার, পরিবার, সামাজিক চাপ এবং নিরাপদ অভিবাসনের সংকট।
রামরুর পরিলাক মেরিনা জাহান বলেন, স্কুলভিত্তিক ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি দরকার। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করলে কারা শিশুদের প্রভাবিত করছে, কীভাবে তারা এই পথে যাচ্ছে এবং এর পেছনে কী ধরনের মানসিকতা কাজ করছে? সেসব তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ শিশুরা নিজেরা হয়তো জানে না তারা যে পথে হাঁটছে, সেটি কতোটা বিপজ্জনক। তারা জানে শুধু ইতালি গেলে জীবন বদলে যাবে। দালালরা সেই স্বপ্নটাই বিক্রি করে।
আর সেই স্বপ্নের দাম কখনো লাখ লাখ টাকা, কখনো একটি পরিবারের সর্বস্ব; কখনো একটি শিশুর শিক্ষাজীবন। আর কখনো একটি জীবন।
খালি হয়ে যাচ্ছে স্কুলের বেঞ্চ
মাদারীপুরের স্কুলগুলোর খালি বেঞ্চগুলো তাই শুধু ঝরে পড়ার পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি খালি বেঞ্চের পেছনে আছে একটি শিশু, একটি পরিবার এবং একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।কেউ হয়তো এখন লিবিয়ার কোনো অন্ধকার বন্দিশালায়।কেউ মরুভূমির পথে।কেউ হয়তো ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায়। আর কেউ হয়তো সেই সাগরের পানিতেই চিরতরে হারিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সচেতন করার পাশাপাশি মানব পাচারের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। ভুয়া জন্মনিবন্ধন থেকে পাসপোর্ট তৈরি, দালালের মাধ্যমে দেশ ছাড়ানো, লিবিয়ায় পৌঁছানো এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানো , প্রতিটি ধাপে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।