ঢাকের বাদ্য ও শঙ্খধ্বনিতে আজ শুরু দুর্গোৎসব

ঢাকের কাঠি, শঙ্খধ্বনি, প্রদীপের আলো আর পূজাঅর্চনার মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর বিহিত পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পাঁচ দিনব্যাপী এই আনন্দঘন মহোৎসবের যবনিকা ঘটবে আগামী ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে অশ্রুসজল নয়নে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে।

শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি মণ্ডপ সেজে উঠেছে রঙিন রূপ ও আলো ঝলমলে সাজসজ্জায়। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, নিপুণ ডেকোরেশন আর নিখুঁত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজক কমিটির সদস্যরা।

Durga Puja 03
এবারের দুর্গাপূজাকে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও উৎসমুখর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন ৫০টি থানা এলাকায় মোট ২৫৭টি পূজামণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা।

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর এই ২৫৭টি পূজামণ্ডপকে তাদের গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতা বিচারে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি মণ্ডপকে ‘বৃহত্তম’, ৮১টিকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’, ১১২টিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ৫৫টিকে ‘সাধারণ’ ক্যাটাগরি হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।

এসব মণ্ডপে নিয়োজিত পোশাকধারী পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং সাদা পোশাকের সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবেন। নিরাপত্তা নিছিদ্র করতে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের দেওয়া হয়েছে বডি-ওর্ন ক্যামেরা।

Durga Puja 06
রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় উপ-পুলিশ কমিশনাররা সার্বিক নিরাপত্তার চিত্র তুলে ধরেছেন। মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ জানান, তাঁর বিভাগে ২৪টি পূজামণ্ডপের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে।

রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহেদুল ইসলাম জানান, তাঁর আওতাধীন ১৯টি মণ্ডপের মধ্যে ঐতিহাসিক রমনা কালীমন্দির ও সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরসহ ৩টি মণ্ডপকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়তি পাহারা বসানো হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরা বিভাগের ২১টি পূজামণ্ডপেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। জরুরি সময়ে তাৎক্ষণিক তথ্য দেওয়া-নেওয়া ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও আয়োজকদের নিয়ে থানাভিত্তিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ গঠন করা হয়েছে।

একই সাথে সারা দেশে বিশেষ নিরাপত্তা জোরদারের কথা নিশ্চিত করেছে এসআরবি ফোর্সেস। বাহিনীটির মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, দুর্গোৎসবের নিরাপত্তায় প্রতিদিন ২,৫০০ জন এসআরবি সদস্য মাঠে থাকবেন এবং বাহিনীর ১৫টি ব্যাটালিয়নের ৬ হাজারের বেশি সদস্য সার্বিক সুরক্ষায় কাজ করছেন।

Durga Puja 05
তিনি নিশ্চিত করেন যে, এখন পর্যন্ত পূজাকে ঘিরে কোনো নির্দিষ্ট নাশকতার হুমকি নেই, তবে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রুখতে ডগ স্কোয়াড, বম্ব ডিসপোজাল টিম এবং সাইবার মনিটরিং টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো ঠেকানো এবং প্রতিমা বিসর্জনের পথগুলোতে কড়া নজরদারি থাকবে।

বাঙালি সংস্কৃতিতে দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক দারুণ প্রতীক। এ উৎসবকে ঘিরে দেশের অর্থনীতি, স্থানীয় বাজার ও গণপরিবহনেও তৈরি হয় ইতিবাচক প্রাণচাঞ্চল্য।

পূজা চলার সময় মণ্ডপগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ উন্মুক্ত রাখা, অগ্নিনিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে সাথে সাথে নিকটস্থ পুলিশকে অবহিত করার তাগিদ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। সম্প্রীতি ও ভক্তির আমেজে আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে বলে প্রত্যাশা সবার।