বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বৃদ্ধি

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর দেশের সার্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে একটি বিস্তারিত ও হালনাগাদ তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তিন কর্মকর্তা পরিচালিত এই অনুসন্ধান মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং সার্বিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদলটি ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ঢাকা সফর করে এই ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন পরিচালনা করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের পর দেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেন। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় বর্তমানে রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও সাধারণ জনগণ অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছেন। তাঁরা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ, সভা-সমাবেশ আয়োজন এবং প্রকাশ্য আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ এবং অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম সহিংস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো অবাধে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, নির্বাচনী প্রচারণা চালানো, প্রতিবাদ সভা আয়োজন এবং সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারছে। যেসব স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটছে, তা মূলত স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক স্বার্থ বা সম্পদ দখলের মতো স্থানীয় বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বিগত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দলটি বর্তমানে নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং বিগত সরকারের সময় ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণঅভ্যুত্থানের সহিংসতার কারণে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখনো বজায় রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের যেসব তৃণমূল কর্মী বা সাধারণ সমর্থক দুর্নীতি, সহিংসতা কিংবা নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করতে পারছেন। কিন্তু প্রকাশ্যে দলের পক্ষে সমর্থন প্রদর্শন করলে তাঁরা হয়রানি বা সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন। ফলে আওয়ামী লীগের কিছু সদস্য অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, অনেকে দেশের ভেতরে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছেন বা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

বিগত আওয়ামী সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা ভুয়া ও মিথ্যা মামলাগুলোর বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে তুলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিগত আমলের ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বা মিথ্যা মামলা বাতিল করা হয়েছে এবং পুরোনো অন্যান্য মামলাগুলোর আইনগত পর্যালোচনা কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। তবে বিগত সরকারের মেয়াদে ও জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা, কর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও সাধারণ আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেলেও অনেকেই বিচারের অপেক্ষায় আটক রয়েছেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে দুর্নীতি প্রতিরোধ, পুলিশ প্রশাসনের স্থবিরতা কাটানো ও তাদের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত বিস্তৃত কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি নিয়ে সুশীল সমাজ ও অংশীদারদের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে।