পাঁচ দিনের আনন্দময় আর জমকালো পূজা-অর্চনা, ধূপ-ধুনোর মিষ্টি সুবাস আর ভক্তদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধুর সমাপনী ঘটল। বিষাদের সুর আর গঙ্গার নীল জলরাশিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ধরাধাম ছেড়ে কৈলাসে ফিরে গেলেন ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী দুর্গা। আর এরই সাথে সমাপ্তি ঘটল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের।
বুধবার বিকেলে থেকে সন্ধ্যার মধ্যে রাজধানীর পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটে ঐতিহ্যবাহী বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হাজারো ভক্তের অশ্রুসজল উপস্থিতিতে দেবী দুর্গার প্রতিমাগুলো বিসর্জন দেওয়া হয়। দুপুর গড়ালেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার সুমধুর বাদ্য আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজধানীর রাজপথ।
বিভিন্ন মন্দির, মণ্ডপ ও মহল্লা থেকে সুসজ্জিত ট্রাকে চড়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নিয়ে ভক্তরা বিসর্জনের জন্য প্রতিমাগুলো নিয়ে আসেন বুড়িগঙ্গার ঘাটে। সেখান থেকে বড় বড় নৌকায় করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় নদীর মাঝখানে, আর প্রথা মেনে ভক্তদের জয়ধ্বনির মাঝে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা।
বিসর্জনের প্রতিটি মুহূর্তে ঘাটে ছড়িয়ে পড়ে বিদায়ের করুণ সুর। কেউ শেষবার মায়ের চরণে নিবেদন করেন মনের আকুতি, কেউবা শুভকামনায় নদীর পবিত্র পানি ছিটিয়ে নেন নিজের ও স্বজনদের গায়ে। মহাখালী থেকে বাবার সঙ্গে আসা নবম শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়স্মিতা কিংবা পুরান ঢাকার রীমা রানী, সবার চোখেই ছিল জল। প্রিয়স্মিতার ভাষায়, দশমীর লগ্ন মানেই মন খারাপের শুরু। মা ছিলেন, তাই দিনগুলো আনন্দে কেটেছে। মায়ের কাছে প্রার্থনা, দেশ থেকে সব অপশক্তি দূর করে যেন শান্তি ও মঙ্গল ফিরিয়ে আনেন।
এর আগে সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর বিদায়ী পূজার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় মনকাড়া সিঁদুর খেলা। সধবা নারীরা দেবীর চরণ ও সিঁথিতে সিঁদুর ছুঁইয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং পরে একে অপরের গালে ও কপালে সিঁদুর মেখে পরিবারের সমৃদ্ধি ও স্বামীদের দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
প্রতিমা বিসর্জন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বিশৃঙ্খলামুক্ত রাখতে রাজধানী জুড়ে গড়ে তোলা হয় নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়। সোয়াট, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), নিয়মিত পুলিশ, আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন এবং ফায়ায় সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘাটে ও আশপাশের এলাকায় মোতায়েন ছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন জানান, ওয়াইজঘাটসহ নদীপথ ও সড়কগুলোতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যানজট এড়াতে সড়কগুলো একমুখী করা হয় এবং বিসর্জন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।
পুরোহিতদের শাস্ত্রীয় হিসাব অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটেছিল ‘ঘোটকে’ বা ঘোড়ায় চড়ে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিতবহ হলেও, তাঁর গমন হচ্ছে ‘নৌকায়’। সনাতন বিশ্বাসে নৌকায় দেবীর গমন অত্যন্ত শুভ, যা সমৃদ্ধি, প্রগতি ও শস্যবৃদ্ধির বার্তা বহন করে।
পৌরাণিক বিশ্বাস মতে, প্রতি শরতে মা দুর্গা স্বামীর ঘর কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে আসেন বাপের বাড়ি। পাঁচ দিনের আদর-ভালোবাসা শেষে বিজয়ার দিনে তিনি আবার ফিরে যান পতিগৃহে। চোখের জলে আনন্দময়ী উমাকে বিদায় জানালেও ঢাকের প্রতিটি আওয়াজে ভক্তদের হৃদয়ে আজ একটাই গুঞ্জন—‘আসছে বছর আবার হবে!’