ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে ক্ষুধা জয়ের অনন্য লড়াইয়ে বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূরীকরণের সংগ্রামে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা পরিস্থিতির ওপর প্রকাশিত 'গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ২০২৬' (জিএইচআই) বা বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৯.২ স্কোর অর্জন করে ‘মাঝারি’ বা সহনীয় ক্যাটাগরিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া বিশ্বজুড়ে ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ৮৪তম।

বৈশ্বিক গড় স্কোর ১৮.১ হলেও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গড় স্কোর যেখানে ২৩.৫, সেখানে বাংলাদেশের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এক সংকেত।

বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গত আড়াই দশকে বাংলাদেশ সামাজিক অবকাঠামো ও নারীর ক্ষমতায়নে যে অভাবনীয় রূপান্তর ঘটিয়েছে, তা-ই ক্ষুধা ও অপুষ্টি হ্রাসের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

Global Hunger Strike 2
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে লাখ লাখ নারীর কর্মসংস্থান, তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস সেবা, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিস্তার এবং মেয়েদের শিক্ষার অভূতপূর্ব প্রসার এই অর্জনের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে। এই সমন্বিত প্রয়াসের ফলেই ২০০০ সালে যেখানে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫৪.৯ শতাংশই খর্বকায় বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার সমস্যায় ভুগছিল, ২০২৬ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ২৪.০ শতাংশে। অর্থাৎ খর্বকায়তার হার কমেছে ৩০.৯ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়েলথাঙ্গারহিলফে, হেলভেটাস এবং রুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউটের যৌথ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৈপরীত্যের চিত্র। বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উন্নতি বজায় রাখলেও প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। ২৪.১ স্কোর নিয়ে ভারত এবং ২৫.৫ স্কোর নিয়ে পাকিস্তান ‘গুরুতর’ ক্ষুধা পরিস্থিতির ক্যাটাগরিতে পড়ে রয়েছে।

২০১৮ সালে পাকিস্তানের স্কোর যেখানে ছিল ২৪.০, তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে ২৫.৫-এ পৌঁছানোর মাধ্যমে দেশটির সামগ্রিক অবনতির চিত্র ফুটে ওঠে। লাগামহীন খাদ্য মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র শিশু অপুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং জলবায়ুজনিত নানা বিপর্যয়ের কারণে পাকিস্তানে এই সংকট তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সূচকে ১২২টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১০৬তম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে নেপাল (১৪.৫) ও শ্রীলঙ্কা (১০.২)। ভুটান ও মালদ্বীপের ক্ষেত্রে তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে কোনো স্কোর দেওয়া সম্ভব হয়নি।

Global Hunger Strike 3
বিশ্ব ক্ষুধা সূচক মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়কের ভিত্তিতে ০ থেকে ১০০ স্কেলে হিসাব করা হয়- জনসংখ্যার পুষ্টিহীনতার হার, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার, শিশুদের খর্বকায়তা এবং উচ্চতার তুলনায় কম ওজন (কৃশতা)। এর মধ্যে পুষ্টিহীনতা ও শিশুমৃত্যুর ওপর ৩৩.৩ শতাংশ করে এবং বাকি দুটি শিশু স্বাস্থ্য সূচকের ওপর ১৬.৭ শতাংশ করে ওজন দেওয়া হয়। শূন্য থেকে ১০-এর নিচে স্কোর হলে ক্ষুধা কম, ১০ থেকে ১৯.৯ হলে মাঝারি, ২০ থেকে ৩৪.৯ হলে গুরুতর, ৩৫ থেকে ৪৯.৯ হলে আশঙ্কাজনক এবং ৫০-এর ওপর হলে তাকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হিসেবে গণ্য করা হয়।

লন্ডনভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষক জাভেদ হাসান এবং ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজা জানান, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণই বাংলাদেশকে প্রতিবেশীদের তুলনায় বহু দূর এগিয়ে দিয়েছে। ঘরে ঘরে পুষ্টি শিক্ষা পৌঁছানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ক্ষুধা জয়ের এই যাত্রায় বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৈরি পোশাক খাতে কোটি নারীর অংশগ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস সেবার কারণে বাংলাদেশে অপুষ্টির হার দ্রুত কমেছে। সুইজারল্যান্ডের 'হেলভেটাস', জার্মানির 'ওয়েলথাঙ্গারহিলফে' এবং রুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, চারটি প্রধান সূচক- জনসংখ্যার অপুষ্টির হার, শিশুমৃত্যুর হার, শিশুদের খর্বকায় অবস্থা এবং উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের ওপর ভিত্তি করে ১০০ ভিত্তির এই বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক গণনা করা হয়।